এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২২ ডিসেম্বর, ২০২৩): হাসবুনাল্লাহু - আল্লাহই যথেষ্ট

এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২২ ডিসেম্বর, ২০২৩): হাসবুনাল্লাহু - আল্লাহই যথেষ্ট
ইমাম আহমেদ এল-সায়েদ । মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি

[আমাদের বড় চাচী কয়েক ঘন্টা আগে স্কয়ার হাসপাতালে মারা গেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। কিডনির জটিলতা ছিল, কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি চলে যাবেন, ভাবি নাই। চাচী খুব ভালো মানুষ ছিলেন, আমাদেরকে খুব আদর করতেন, তুই-তুই করে কথা বলতেন। ভাবলাম এইখানে স্মৃতি হিসাবে লিখে রাখি।  আর এখন কিংবা ভবিষ্যতে কেউ লেখাটা পড়লে চাচীর জন্য একটু দোয়া করবেন। চাচাসহ চাচীর পরিবারের সবাইকে আল্লাহ যেন ধৈর্য্য ধরার তৌফিক দেন। আমিন।]

ইমাম বললেন একটা সহীহ হাদিস আছে যেখানে রাসূল (সাঃ) তাঁর নিজের সম্পর্কে বলেছেন যে আল্লাহ তাঁকে 'আল-মুতাওয়াক্কিল' নাম দিয়েছেন, যার অর্থ যিনি আল্লাহ'র উপর পুরাপুরি ভরসা করেন। ইমাম বললেন, রাসূল (সাঃ)'র জীবনী বা সীরাহ পড়লে আমরা দেখতে পাই যে, অবস্থা তাঁর অনুকূলে না থাকলেও কিভাবে তিনি আল্লাহ'র উপর ভরসা করে বার বার এগিয়ে গিয়েছেন। ইমাম উদাহরণ দিয়ে বললেন, যখন রাসূল (সাঃ) আল্লাহ তা'য়ালার নির্দেশে প্রথম মক্কায় প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দিলেন,  তখন তাঁর আপন চাচা [খুব সম্ভবত আবু লাহাব]-ই, যিনি কিনা কুরাইশদের নেতা, ক্ষমতা, অর্থ-বিত্তে প্রভাবশালী - তিনিই সেটা অগ্রাহ্য করলেন। শুধু তাই না, তার নিজের ভাতিজার বিরুদ্ধে শত্রুতা করা শুরু করলেন। ইমাম একবার ভেবে দেখতে বললেন, সবকিছুই যখন নিজেদের প্রতিকূলে, আমরা কী পারি সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে?

ইমাম আরো বললেন, হিজরতের সময় শুধু মাত্র একজন সঙ্গী, আবু বকর (রাঃ) কে নিয়ে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করলেন। শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে যখন গুহায় লুকিয়ে আছেন, যখন শত্রু আক্ষরিক অর্থেই মাথার উপর দাঁড়িয়ে, আবু বকর (রাঃ) তো ঘাবড়িয়ে বলেই ফেললেন, ওরা শুধু একটু নিচে তাকালেই আমাদের দেখে ফেলবে - তখন রাসূল (সাঃ)  তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, "চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথেই আছেন"। যেটা পরে আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনের আয়াত করে সংরক্ষণ করে রেখেছেন [সূরা তাওবা, সূরা নম্বর ৯, আয়াত ৪০]। 

ইমাম আরো উদাহরণ দিলেন, বদরের যুদ্ধে মুসলিমদের কোনো হিসাবেই বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু আল্লাহ'র সাহায্যের প্রতিশ্রুতিতে রাসূল (সাঃ) এগিয়ে গেছেন, পরে বিজয়ীও হয়েছেন। আরো বললেন,  হুদাইবিয়ার সন্ধিতে আপাতঃ দৃষ্টিতে মুসলিমদের পরাজয় হয়েছিল। রাসূল (সাঃ)'র সাহাবীরা তা মেনে নিতে পারছিলেন না। এমনকি আবু বকর (রাঃ), ওমর (রাঃ)'র মতো সাহাবীরাও অনেকটা বিরুদ্ধেই ছিলেন, কিন্তু রাসূল (সাঃ) আল্লাহ'র উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করেই এগিয়ে গেছেন। যার ফলে, দুই বছরের মাথায়ই বিরাট মুসলিমদের নিয়ে রাসূল (সাঃ) মক্কায় প্রবেশ করেছেন, কাবা তাওয়াফ করেছেন। 

এরপর ইমাম একটা সহীহ হাদিস বললেন, যেখানে রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ইব্রাহিম (আঃ) কে যখন তখনকার লোকেরা আগুনের কুন্ডুলিতে ছুঁড়ে দিচ্ছিল, জিরবাঈল (আঃ) নাকি এসে ইব্রাহিম (আঃ) কে সাহায্য করতে চাইলে ইব্রাহিম (আঃ) বলেছিলেন, "হাসবুনাল্লাহু নি'মাল ওয়াকিল' - "আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনিই উত্তম ওয়াকিল (বা অভিভাবক)"! পরে আল্লাহ'র নির্দেশ দিলেন [সূরা আল আনবিয়া, সূরা নম্বর ২১, আয়াত ৬৯], যার অর্থ: "আমরা বললাম, হে আগুন, শীতল ও আরাম/নিরাপদ হয়ে যাও ইব্রাহিমের জন্য"। একই ভাবে, রাসূল (সাঃ) কে আর মুসলিমদেরকে [খুব সম্ভবত খন্দকের যুদ্ধে] যখন বলা হলো, লোকেরা তোমাদের বিরুদ্ধে জড়ো হয়েছে,  তাদের ভয় করো, তখন তিনি এই একই কথা বলেছিলেন:  "হাসবুনাল্লাহু নি'মাল ওয়াকিল' - "আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনিই উত্তম ওয়াকিল (বা অভিভাবক)"!  কুরআনে আল্লাহ এই ঘটনা সংরক্ষণ করেছেন আয়াত হিসাবে, সূরা আলে-ইমরান, সূরা নম্বর ৩,  আয়াত ১৭৩। 

ইমাম আরো উদাহরণ দিলেন, যখন ইউনুস (আঃ) মাছের পেটে, তিনি তিন স্তরের অন্ধকারের মধ্যে - প্রথমটা রাত, দ্বিতীয়টা সমুদ্রের পানির নিচে, আর তৃতীয় স্তর মাছের পেটের অন্ধকারের মধ্যে, যখন তাঁর কোনো কথাই কারো শোনার উপায় নেই, তখন তিনি আল্লাহ'র উপর ভরসা করে দোয়া করলেন, বললেন [সূরা আল-আনবিয়া, সূরা ২১, আয়াত ৮৭]: "লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা, ইন্নি কুন্তু মিনাজ জোয়ালিমিন" - আপনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ [মাবুদ] নাই, আপনি পবিত্র/মহান, নিশ্চয়ই আমি জুলুমকারীদের অন্তর্ভুক্ত [অর্থাৎ, নিজের উপর জুলুম করেছি]" - ইমাম বললেন,  এর পরের আয়াতেই আল্লাহ বলছেন, "ফাস তা-জাবনা", খেয়াল করতে বললেন, আল্লাহ কিন্তু বলেন নাই "সুম্মা-তা জাবনা" [সুম্মা - অতঃপর, তারপর], আল্লাহ ব্যবহার করেছেন "ফা" - অর্থাৎ আল্লাহ সাথে সাথেই তাঁর দোয়ার জবাব দিয়েছেন, দোয়া কবুল করে তাঁকে উদ্ধার করেছেন।

ইমাম বললেন, আমরা যখনই অন্যকিছুর উপর, সেটা আমাদের ক্ষমতা, অর্থ, সম্পদ কিংবা লোকজনের উপর ভরসা করবো, তখনই আমরা ভুল করছি, কারণ সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী। মুহূর্তেই সবকিছুই শেষ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আল্লাহ "আল-হাইইউ, আল-কাইয়ুম"  - তিনি চিরঞ্জীব, তিনি সবার ধারক [সাস্টেইনার], তার উপর ভরসা করলেই আমরা আমাদের যেকোনো সমস্যা, বিপদ থেকে মুক্তি পাবো। আমাদের শুধু বিশ্বাস রেখে ধৈর্য্য ধরতে হবে। তাই, বিপদে পড়লেই আমরা যেন দোয়া করি: "হাসবুনাল্লাহু নি'মাল ওয়াকিল ওয়া নি'মাল মাওলা ওয়া নি'মান নাসির" যার অর্থ: "আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনিই উত্তম অভিভাবক ও উত্তম রক্ষক ও উত্তম সাহায্যকারী".            

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ