এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২৯ ডিসেম্বর, ২০২৩): নিজের উপর আগ্রাসন, নিপীড়ন
এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২৯ ডিসেম্বর, ২০২৩): নিজের উপর আগ্রাসন, নিপীড়ন
উস্তাদ সাবের কাদাক । মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি
[সাইডনোট: একবার ভেবেছিলাম এই সপ্তাহের খুতবার সারমর্ম লিখবো না। বাসায় বন্ধুরা ছিল, ব্যস্ততা আর আড্ডায় সময় চলে গেছে, ঠিক মতো খুতবার আলোচনাও আসলে মনে নাই। কিন্তু পরে মনে হলো, যতটুকু মনে আছে, ততটুকুই লিখে রাখি। বছরের শেষ খুতবা। ইমাম খুব দরকারি একটা টপিকের উপর আলোচনা করেছিলেন। নিজের তো অবশ্যই, আর অন্যদেরও হয়তো উপকারে আসবে। কিন্তু ডিসক্লেইমার: রেফারেন্স অতোটা দিচ্ছি না, নিজের মতো করেই লিখছি।]
ইমাম বললেন আমরা গাজাতে চলা নিপীড়ন, আগ্রাসনের ব্যাপারে খুবই ওয়াকিবহাল। আমরা অবশ্যই এর প্রতিবাদ জানাই, ধিক্কার দেই, নিপীড়িতদের জন্য দোআ করি। আল্লাহ যেন তাদের রক্ষা করেন, ধৈর্য্য দেন, শক্তি দেন, বিজয়ী করেন। কিন্তু আমরা যে প্রতিনিয়ত নিজেদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন, আগ্রাসন চালাচ্ছি, সেটা কী আমরা খেয়াল করে দেখছি? এই নিপীড়ন আমরা জেনে, না-জেনে আমাদের অন্তরের বিরুদ্ধে করছি। ইমাম বললেন, একটা সহীহ হাদিস আছে, যেখানে রাসূল (সাঃ) বলেছেন, যা অনেকটা এইরকম: "জেনে রাখো, শরীরে এক টুকরো মাংস আছে, যা ভালো থাকলে পুরো শরীর ভালো থাকে, আর যা খারাপ হলে পুরো শরীর খারাপ থাকে, আর তা হচ্ছে হৃদপিন্ড/অন্তর।"
ইমাম আরেকটা হাদিস প্যারাফ্রেসিং বা নিজের মতো করে বললেন: রাসূল (সাঃ) নাকি বলেছেন, কেউ যখন কোনো গুনাহ বা খারাপ কাজ করে, তখন তার অন্তরে একটা দাগ পড়ে। আর তওবার মাধ্যমে সেই দাগ মুছে ফেলা যায়। আরেকটা হাদিস বললেন, যেখানে রাসূল (সাঃ) নাকি বলেছেন: দুই ধরণের অন্তর আছে, যার একপ্রকার হচ্ছে প্রলোভন বা টেম্পটেশন সামনে আসলে তা স্পঞ্জের মতো (সুতা বুনা কাপড়ের মতো) তা শুষে নিতে থাকে, এক পর্যায়ে তা কালো হয়ে যায়। সেই পর্যায়ে এই অন্তর ভালো আর মন্দের, সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য করতে পারে না। আর এক প্রকার অন্তর হচ্ছে, যা প্রলোভন বা টেম্পটেশনকে দূরে ঠেলে দিয়ে অন্তরকে পরিষ্কার রাখতে পারে। ইমাম বললেন আমাদের সবসময় চেষ্টা করতে হবে অন্তরকে প্রলোভন থেকে বাঁচিয়ে রাখতে।
এরপর ইমাম বললেন, বছরের শুরুতেই অনেকে অনেক ধরনের নিউ ইয়ার রেসল্যুশন বা নতুন বছরের প্রতিজ্ঞা করে। বললেন, তিনি প্রথমত নিজেকে তারপর অন্যদের জন্য তিনটা বিষয়ের উপর উপদেশ দিবেন। প্রথমতঃ ইমাম আহ্বান করলেন, চলেন আমরা প্রতিজ্ঞা করি নতুন বছরে আমরা আমাদের সময়ের ব্যবহারের ব্যাপারে সাবধান হবো। ইমাম বললেন, তিনি জানেন এই কাজটা করা খুব কঠিন কাজ হবে, কিন্তু ধীরে ধীরে আমাদের চেষ্টা করতে হবে মোবাইল ফোন দেখা কমাতে। ইমাম বললেন, আমরা মোবাইলে স্ক্রল করতে করতে খেয়ালই করি না যে কত সময় চলে গেছে। তার উপর অনেক সময়ই স্ক্রল করতে করতে এমনসব জিনিস সামনে হয়তো চলে আসে, আমরা দেখি বা শুনি যা আমাদের দেখা বা শোনা ঠিক না। এই দেখা আর শোনায় আমাদের অন্তরে দাগ পড়ে। আর এই দাগ পড়তে পড়তে একসময় আমাদের অন্তর ওই হাদিসে বলা স্পঞ্জের মতো হয়ে যেতে পারে। ইমাম পরিষ্কার করলেন, তিনি বলছেন না মোবাইলে ভালো কিছু নাই, অবশ্যই আছে, কিন্তু এর ব্যবহারে আমাদের সাবধান আর সীমিত হতে হবে।
এরপর বললেন, ভেবে দেখতে আমরা মোবাইলে যত সময় ব্যয় করি, সেই সময়টা হয়তো কুরআন পড়ায়, কোনো সূরা মুখস্থ করায়, কিংবা তাফসীর, হাদিস পড়ায় ব্যয় করতে পারি। বললেন, এইটা খুব আফসোসের বিষয় হবে যখন আল্লাহর সামনে আমরা দাঁড়াবো, আর তখন যদি আমাদের বলতে হয় যে বেঁচে থাকতে আমাদের এইসব পড়ার সময় ছিল না! এরপর ইমাম দ্বিতীয় উপদেশ দিলেন, বললেন: আমরা যেন অনলাইনে যেনতেন ভিডিও দেখে, আলোচনা শুনে আমাদের দ্বীন সম্পর্কে শিখতে না যাই। আমাদের উচিত স্থানীয় ইমাম, আলেমের কাছ থেকে সঠিক উপায়ে দ্বীন সম্পর্কে শেখা। অনলাইনে শিখতে গেলে যেন প্রতিষ্ঠিত ইসলামী স্কুলের কোর্স করে শিখি। মজা করে বললেন, তিনি অনুরোধ করছেন, মুরুব্বিরা যেন কোনো ইসলামী ভিডিও পেলেই গ্রুপে শেয়ার দিয়ে না দেন। যেকোনো ভিডিও পেলে সেটার সত্যতা, সোর্স যাচাই করে তারপরেই যেন শেয়ার দেন। ইমাম আরো বললেন, অনলাইনে, সামাজিক মাধম্যে কোনো কিছু শেয়ার দেয়ার সময়, লেখার সময়ও যেন আমরা খেয়াল রাখি আমরা মুসলিম, আমাদের আদব যেন বজায় থাকে। আমরা যেন অন্যকে আঘাত করে, গালিগালাজ করে কিছু না লিখি।
সবশেষে বললেন [যেটা আসলে হয়তো আমেরিকার মসজিদের বেলায়ই বেশি প্রযোজ্য], আমরা যেন নতুন বছরে প্রতিজ্ঞা করি খাবার অপচয় করবো না। আর অন্য যেকোনো কিছুর ব্যাপারেই মিতব্যয়ী হবো। নতুন মোবাইল, কিংবা টেক বাজারে নতুন কোনো গেজেট আসলেই যেন হুমড়ি খেয়ে সেটা কিনতে ব্যস্ত হয়ে না পড়ি। বললেন, সবার চাহিদা মেটাতে কোম্পানি গুলো নিত্য-নতুন পণ্য বাজারে আনতে সবসময়ই উদগ্রীব। আর এটা আমাদের পৃথিবী, পরিবেশ আর পশু-পাখির উপর চাপ সৃষ্টি করছে।
সবশেষে ইমাম বললেন, ফিলিস্তিনে যেইভাবে মুহুর্মুহু বোমা হামলা হচ্ছে, আমরা যেন একইভাবে আমাদের অন্তরের বিরুদ্ধে গুনাহর বোমা প্রতিনিয়ত না চালাই; ফিলিস্তিনে আগ্রাসন চালিয়ে সেটেলাররা বা বসতি স্থাপনকারীরা যেইভাবে জায়গা দখল করে নিচ্ছে, আমরা আমাদের অন্তরের বিরুদ্ধে অগ্ৰাসন আর নিপীড়ন চালিয়ে যেন অন্তরে কালো দাগ দিয়ে ভরিয়ে না ফেলি।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন