এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪): শাবান মাসের সুন্নাহ আর উমরের (রাঃ) নসিহত
ইমাম শিবলী । ইসলামিক সোসাইটি অফ সেন্ট্রাল জার্সি, নিউ ব্রান্সউইক টাউনশিপ, নিউ জার্সি
ইমাম বললেন, দুই-একদিন পরেই শাবান মাস শুরু হচ্ছে, আর তার পরের মাসই রামাদান। শাবান মাসে আমাদের রাসূল (সাঃ) বেশি বেশি রোজা রাখতেন - এটা সবাই আমরা কমবেশি জানি। আর তাঁর এই রোজা রাখার কারণ নিয়ে একটা সহীহ হাদিস আছে, যেখানে কিশোর বয়সী উসামা ইবনে জায়েদ নাকি রাসূল (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করেছিলেন: "ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ), আমি আপনাকে অন্য মাসে শাবান মাসের মতো বেশি বেশি রোজা রাখতে দেখি না"। উত্তরে রাসূল (সাঃ) যা বলেছিলেন, তা অনেকটা এই রকম: "এই মাস রজব আর রমাদানের মাঝে এমন একটা মাস যেটাকে মানুষজন অবহেলা করে। এই মাসে মানুষের আমল বিশ্বজাহানের রবের কাছে পৌঁছে, আর আমি চাই আমার আমল যেন রোজা রাখা অবস্থায় তাঁর কাছে পৌঁছে"।
ইমাম বললেন, আপনি রমাদান আসার আগে এই শাবান মাসে কী আমল করবেন? - এই প্রশ্নের উত্তরে যদি আপনি বলেন অন্য সব মাসের মতোই আমি আমার দিনযাপন করবো, ঘুম থেকে উঠবো, কাজে যাবো, কাজ শেষে বাসায় ফিরে টিভি দেখবো, রাতের খাবার খেয়ে পরেরদিনের জন্য আবার ঘুমিয়ে পড়বো - তাহলে আপনি রাসূল (সাঃ)'র সুন্নত থেকে অনেক দূরে থাকলেন। এরপর ইমাম সবাইকে বলতে বললেন, বলুন "ইনশাআল্লাহ" আমরা রাসূল (সাঃ)'র সুন্নত অনুযায়ী রোজা রাখার চেষ্টা করবো। মসজিদের মুসল্লিরা সবাই 'ইনশাআল্লাহ' বললেন।
এরপর ইমাম আরো বললেন, রাসূল (সাঃ) মাসুম ছিলেন। আল্লাহ'র ইচ্ছায় তাঁর কোনো গুনাহ ছিল না। আল্লাহ তা'য়ালার কাছে তাঁর শুধু ভালো আমলগুলোই পৌঁছাবে। তারপরেও তিনি এই ব্যাপারে চিন্তিত ছিলেন, চাইতেন আমল পৌঁছানোর সময় রোজা থেকে যেন একটু অতিরিক্ত ভালো আমল পৌঁছায়। সেই হিসাবে, আমাদের ভালো-খারাপ আমল যখন পৌঁছাবে, তখন আমাদের তো উচিত খুব গুরুত্ব সহকারে এই শাবান মাসের আমলকে নেয়া উচিত। সুন্নত হিসাবে বেশি বেশি রোজা রাখার চেষ্টা করা উচিত।
এরপর ইমাম বললেন, আরেকটা হাদিসে আছে, মধ্য শাবানে আল্লাহ তা'য়ালা নাকি তাঁর বান্দাদের মাফ করেন। শুধু ২ ধরনের বান্দার এর ব্যতিক্রম, যাদেরকে তিনি মাফ করেন না: এক, যারা মুশরিক - অর্থাৎ যারা শিরক করে, যারা আল্লাহ ছাড়াও অন্য কিছুর উপাসনা করে। ইমাম বললেন, আলহামদুলিল্লাহ, আমরা যারা এইখানে আছি, তারা ওই দলে ইনশাআল্লাহ পড়ি না। আর আরেক ধরণ হচ্ছে যারা "মুশাহিন"। এই মুশাহিন শব্দের অর্থ যারা মনে বিদ্বেষ পোষণ করে। ইমাম বললেন, আমাদের মধ্যে যারা অন্যদের সাথে সম্পর্ক রাখে না, কথা বলে না - এই অন্যদের বলতে নিজেদের স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে , মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, শ্বশুর-শ্বাশুড়ি কিংবা শ্বশুর-শ্বাশুড়িকুলের আত্মীয়স্বজনদের সাথে কথা বলে না, সম্পর্ক রাখে না - এদের কথা বলা হয়েছে। আমাদের সাবধান থাকতে হবে আমরা যেন এই দলে না পড়ি।
এরপর ইমাম উমর (রাঃ) তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহকে একটা নসিহত বা উপদেশ দিয়েছিলেন, সেটা সম্পর্কে বললেন। ইমাম বললেন, আমাদের যাদেরই সন্তান-সন্ততি আছে, কিংবা নাতি-নাতনি আছে তারাই এই উপদেশটা তাদেরকে দিতে পারি। আর যাদের এখনো বিয়ে হয় নাই, কিংবা সন্তান-সন্ততি, নাতি-নাতনি নাই, তারা অন্যদের, যাদের আছে তাদেরকে উপদেশটা নিজেদের পক্ষ থেকে পৌছিয়ে দিতে পারি। উমর (রাঃ), তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহকে ডেকে প্রথমেই বলেছিলেন: "আল্লাহকে ভয় করো (তাকওয়া) আর তাঁর বাধ্য থেকো"। ইমাম বললেন, আমরা আমাদের সন্তানদের খোঁজ-খবর নিতে গেলেই প্রথমেই জিজ্ঞেস করি তাদের পড়াশুনা কেমন চলছে, রুজি-রোজগার করলে জিজ্ঞেস করি চাকরি বা ব্যবসা ভালো যাচ্ছে কিনা। হয়তো শরীর-মন-স্বাস্থ্যের কথা জিজ্ঞেস করি। কিন্তু হয়তো কখনোই জিজ্ঞেস করি না তাদের তাকওয়ার অবস্থা কি? আমলের অবস্থা কি? ইমাম বললেন, উমর (রাঃ)'র এই উপদেশ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, আত্মিক অবস্থার কথাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে, তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে হবে।
[সাইডনোট: সেইদিন আরেকটা হাদিস শুনে বেশ ধাক্কা খেয়েছি। ড. ইয়াসির ক্বাদীর সিরাহ সিরিজের ৬২/৬৩ নম্বর এপিসোড তিনি এই হাদিসের কথা বলেছেন। বুখারীর সহীহ হাদিসে নাকি আছে, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, যার অর্থ অনেকটা এইরকম: "যে অন্যকে তার জন্য উঠে দাঁড়াতে দেখতে পছন্দ করে, সে যেন নিজের জন্য জাহান্নামের আগুনে বসার আসন দেখতে প্রস্তুত থাকে।" রাসূল (সাঃ) তাঁর সাহাবীদেরকে নাকি কখনোই তাঁর জন্য উঠে দাঁড়াতে বলেন নাই। ড. ইয়াসির ক্বাদী অবশ্য পরিষ্কার করলেন, বাসায় কোনো মেহমান কিংবা মুরুব্বি কেউ আসলে তাঁকে বরণ করতে উঠে দাঁড়ালে অসুবিধা নাই। কিন্তু সন্মান দেখাতে কেউ আসলে দাঁড়াতে হবে - এই প্রাকটিস এই হাদিসের পরিপন্থী। আমার সাথে সাথে, স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটির ক্লাসের কথা মনে হয়েছে। শিক্ষক ক্লাসে আসলে আমরা তো সবসময় দাঁড়াতাম! ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়, একবার এক নতুন শিক্ষক যিনি মাত্রই পাস করে শিক্ষক হয়েছেন, আমাদের ক্লাস তখনো নেন নাই, আমরা ঠিকমতো চিনতামও না - করিডোরে সবাই বসে ছিলাম, উনি হেঁটে যাওয়ার সময় কেন উঠে দাঁড়াই নাই - সেটা নিয়ে পরে অভিযোগ করেছিলেন!]
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন