এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪): হতাশা, মন খারাপ বা ডিপ্রেশন থেকে বাঁচার উপায়
এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪): হতাশা, মন খারাপ বা ডিপ্রেশন থেকে বাঁচার উপায়
ইমাম শেখ আহমেদ খাতের । ইসলামিক সোসাইটি অফ সেন্ট্রাল জার্সি, নিউ ব্রান্সউইক টাউনশিপ, নিউ জার্সি
[সাইডনোট: ইদানিং ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় ঠিকমতো লেখার সময় হয় না। লিখতে বসলেও অনেকটা দায়সারা ভাবে লিখি। সত্যি বলতে নিজেকে মুনাফিক মনে হয়। 'মুনাফিক' নিয়ে কিছু লেখা, লেকচার শুনেছি ঐগুলোর সারমর্ম যে লিখবো, তাও সময় করতে পারছি না। যাই হোক, গত শুক্রবারের খুতবাটা ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আসা এক শেখ দিলেন। মন খারাপ, হতাশা বা ডিপ্রেশন থেকে বাঁচার, উদ্ধার পাওয়ার উপায় নিয়ে আলাপ করলেন। গাজায় চলা গণহত্যার ঘটনা দেখে যখন সবাই কম-বেশি হতাশা বা ডিপ্রেশনে ভুগছেন, তখন উনার এই খুতবাটা হয়তো কারো কারো কাজে লাগবে - তাই-ই লিখছি। ইমাম বেশ অনেকগুলো রেফারেন্স দিয়ে আলোচনা করেছেন। আমি শুধু কয়েকটা দিয়েই মূল সারমর্ম লিখছি। আর সবশেষে কয়েকদিন আগে ইমাম সাফওয়ান ঈদের এশার নামাজের পর 'খাতারা'তে বলা 'আল্লাহ আপনাকে ভালোবাসেন কিনা বুঝবেন কিভাবে?' - এই ব্যাপারটা নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করেছিলেন, সেটা লেখার ইচ্ছা আছে। দেখা যাক কতটুকু লিখতে পারি।]
ইমাম শুরু করলেন বলে যে কুরআনে মন খারাপের জন্য তিন ধরনের শব্দ ব্যবহার হয়েছে। 'হুযুন', 'গাম' আর 'হাম'। ইমাম বললেন, সাধারণভাবে অতীতে ঘটা কোনো কারণ নিয়ে মন খারাপ বোঝাতে 'হুযুন' শব্দ, বর্তমানে চলছে এমন ঘটনায় মন খারাপ বোঝাতে 'গাম' আর ভবিষ্যতের জন্য 'হাম' শব্দ ব্যবহার হয়েছে।
ইমাম বললেন, মন খারাপ, হতাশা বা ডিপ্রেশন মানুষমাত্রেরই হবে। আমাদের নবী-রাসূলরাও মন খারাপ বা হতাশার মধ্যে দিয়ে গেছেন। কাজেই, কুরআন কিংবা এরপর আমাদের রাসূল (সাঃ)'র সুন্নতে যে এর প্রতিকার থাকবে - সেটাই স্বাভাবিক। ইমাম বললেন, গাজায়সহ দুনিয়ার অন্য জায়গায় মুসলিমদের উপর যে নিপীড়ন হচ্ছে, সেটা দেখে আমাদের অনেকেরই মন খারাপ থাকে, হতাশ লাগে, কেউ কেউ হয়তো ডিপ্রেশনেও ভুগছেন। উনি কয়েকবারই পরিষ্কার করলেন যে উনার আজকের খুতবা কোনোভাবেই ডিপ্রেশনের প্রতিকার বা চিকিৎসার বিরুদ্ধে না। অবশ্যই আমাদের যাদের এই ব্যাপারে সাহায্য দরকার, তারা যেন চিকিৎসকের কাছে যাই। তবে তাঁর খুতবা আত্মিকভাবে কিভাবে সেটার মোকাবেলা করা যায় সেটা নিয়ে আলাপ করবেন।
ইমাম নবী-রাসূলরাও যে কখনো কখনো মন-খারাপ বা হতাশায় ভুগেছেন, তার উদাহরণ দিয়ে গিয়ে ইয়াকুব (আঃ)'র রেফারেন্স দিলেন। আমাদের রাসূল (সাঃ) তাঁর একজন না, ছয় সন্তানকে হারিয়েছেন সেটা বললেন। তাঁর (সাঃ) ছেলে ইব্রাহিমকে হারিয়ে তিনি অনেক কেঁদেছেন। সাহাবীরা তো জিজ্ঞেস করেই বসেছিলেন, যে "ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আপনিও?!" উত্তরে রাসূল (সাঃ) বলেছিলেন, সহীহ হাদিসে আছে, যার অর্থ অনেকটা এইরকম: "নিশ্চয়ই চোখ থেকে অশ্রু ঝরে, হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়, আর আমরা তোমার চলে যাওয়ায় মর্মাহত হে আব্দুল্লাহ। কিন্তু আমরা আল্লাহকে খুশি করে ব্যতিরেকে আর কিছুই বলবো না [অর্থাৎ, আল্লাহর সিদ্ধান্ত মেনে নিবো, আর আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে এমন কিছুই বলবো না] । [সাইডনোট: এক জায়গায় সম্ভব শুনেছিলাম, বা পড়েছিলাম: কারো মৃত্যুতে মাতম করে কান্না-কাটি করা ইসলামে জায়েজ নাই।]
ইমাম বললেন, আমাদের অনেকের মাঝে একটা ভুল ধারণা আছে যে ধার্মিক হতে হলে উৎফুল্ল থাকা যাবে না। সবসময় গম্ভীর, মন-খারাপ করে থাকতে হবে। এই ধারণার পেছনে তিনি কয়েকজন আলেমের মতবাদ আছে - এমনটাও বললেন। তাঁরা নাকি বলতেন যে মন-খারাপ অবস্থাতেই আল্লাহর কাছাকাছি হওয়া যায়। ইমাম বললেন, এটা ভুল একটা ধারণা, মতবাদ। পরে অনেক আলেমরা এর বিপক্ষে যুক্তি দিয়েছেন, আলোচনা করেছেন। আর আমাদের রাসূল (সাঃ) সবসময়ই হাসিমুখে থাকতেন। অবশ্য ইমাম এটাও বললেন যে, আমরা কখনোই আল্লাহ'র ইবাদতে পারফেক্ট হতে পারবো না। কারো হয়তো নামাজ ছুটে যাবে, কেউ হয়তো এমনকিছু দেখে ফেলবো, বা বলে ফেলবো যেটা আমাদের করা উচিত না - সেগুলো উপলব্ধি করে যখন আমাদের মন খারাপ হয় - তখন এই "মন খারাপের" জন্য না বরং মন খারাপের পেছনে যে কারণ, সেই ঈমানের কারণে আমাদের সওয়াব হবে।
ইমাম আবু হুরাইরা বর্ণিত একটা সহীহ হাদিস বললেন, যেখানে রাসূল (সাঃ) বলেছেন, যার অর্থ অনেকটা এইরকম: একজন মুসলিমের জন্য এমন কিছু নাই - যেকোনো দুর্বলতায়, অসুস্থতায়, দুঃখে, মন খারাপে, আঘাতে, হতাশায় - এমনকি যদি সামান্য একটা কাটার খোঁচাও হয় - যার জন্য আল্লাহ তার কিছু গুনাহ মাফ করে দেন না।
এরপর ইমাম চারটা-পাঁচটা উপায় বললেন যার মাধম্যে আত্মিকভাবে আমরা মন-খারাপ, হতাশা কিংবা ডিপ্রেশনের মোকাবেলা করতে পারবো। প্রতিটা পয়েন্টেরই আলোচনা করেছেন, আমি শুধু পয়েন্ট করে লিখে দিচ্ছি: ১. বেশি বেশি মৃত্যু চিন্তা করা। এতে করে আমাদের উপলব্ধি হবে যে দুনিয়ার যেকোনো সমস্যাই আসলে ক্ষণস্থায়ী। একদিন এর শেষ হবেই। ২. আখিরাতের চিন্তা করা - আখিরাতের অনন্ত জীবনের চিন্তা করে, এর প্রতিদানের আশায় কাজ করে যেতে হবে। ৩. বেশি বেশি রাসূল (সাঃ)'র উপর সালাম দেয়া। ৪. বেশি বেশি ইস্তেগফার করা [আস্তাগফিরুল্লাহ বলে মাফ চাওয়া] আর ৫. বেশি বেশি আল্লাহ'র কাছে দোয়া করা। বললেন, দোয়ার শক্তির কথা আমরা যেন ভুলে না যাই। ইমাম বললেন, মুসলিম হিসাবে আমাদের হতাশ হলে চলবে না।
ইমাম সাফওয়ান ঈদের 'খাতারা':
------------------------------------
ইমাম বললেন কুরআনে বেহেশ্তবাসীদের বর্ণনায় একটা আয়াত পড়তে গিয়ে তিনি একটা জিনিস উপলব্ধি করেছেন, সেটা আলোচনা করতে চান। আল্লাহ বলছেন [সূরা আল-বাইয়িনাহ, সূরা নম্বর ৯৮, আয়াত ৮]: "আল্লাহ তাঁদের [বেহেশতবাসীদের] উপর সন্তুষ্ট আর তাঁরাও আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট।"
ইমাম বললেন, আল্লাহ আপনাকে-আমাকে কী ভালোবাসেন? তিনি কী আমাদের উপর সন্তুষ্ট? এই প্রশ্নের খুব সহজ উত্তর হচ্ছে উল্টো নিজেকে প্রশ্ন করা, আপনি-আমি কী আল্লাহ'র উপর সন্তুষ্ট? এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা যেন মুখস্ত উত্তর "হ্যাঁ, আমি সন্তুষ্ট, আমি অবশ্যই আল্লাহকে ভালোবাসি" - না বলে বরং সত্যি সত্যি চিন্তা করি, আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, তাতে কী আমি সন্তুষ্ট? এই 'যা দিয়েছেন' - সেটা শুধু দুনিয়ার জিনিস না, বরং আল্লাহর দেয়া কুরআনে আমি কি সন্তুষ্ট? তাতে যে বিধান, বিধি-নিষেধ আছে, তাতে কি আমি সন্তুষ্ট? আল্লাহ'র প্রেরিত নবী-রাসূল (সাঃ)'র উপর কি আমি সন্তুষ্ট, তাঁদের সুন্নাহতে কী আমি সন্তুষ্ট? - এইসব গুলা প্রশ্নের উত্তর গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। তবেই আমরা আসলেই আমরা কী আল্লাহ'র উপর সন্তুষ্ট কিনা সেটা বুঝতে পারবো, আর তখনই আল্লাহ কী আমাদের উপর সন্তুষ্ট কিনা - সেই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবো।
[সাইডনোট: আরেকটা লেকচারে এই ব্যাপারে অনেকটা একই কথা শুনেছিলাম, যতটুকু মনে আছে, তা ছিল, আল্লাহ আপনার-আমার উপর সন্তুষ্ট কিনা সেটা চার উপায়ে বোঝা যাবে: ১. আপনি-আমি কি আল্লাহ'র উপর সন্তুষ্ট? ২. আমরা কি আল্লাহ'র ইবাদত করা [নামাজ, রোজা, জাকাত - ইত্যাদি] সহজ মনে করি, সহজে করতে পারি? ৩. আপনার-আমার মুসলিম বাবা-মা কি আসলেই আমাদের উপর সন্তুষ্ট আছেন বা ছিলেন? ৪. আপনার-আমার আশেপাশের মানুষজন কি আমাদের উপর খুশি আছে?]
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন