এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২১ জুন, ২০২৪): হ্বজ থেকে আমাদের যা শিক্ষণীয় ইমামের নাম জানি না । ইসলামিক সোসাইটি অফ সেন্ট্রাল জার্সি, নিউ ব্রান্সউইক টাউনশিপ, নিউ জার্সি

এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২১ জুন, ২০২৪): হ্বজ থেকে আমাদের যা শিক্ষণীয়
ইমামের নাম জানি না । ইসলামিক সোসাইটি অফ সেন্ট্রাল জার্সি, নিউ ব্রান্সউইক টাউনশিপ, নিউ জার্সি

শুরুতেই ইমাম বললেন, এইবার হ্বজে প্রচন্ড গরমে শতাধিক হাজ্জি মারা গেছেন। এই মৃত্যু আমাদের অনেককেই হয়তো ভাবায়: হ্বজ কী এতো গরমে করতেই হবে? বছরের অন্য সময়ে হ্বজ করলে অসুবিধা কোথায়? ইমাম বললেন, এই চিন্তা বা প্রশ্নের কোনো সুযোগ নেই, কেননা কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন [সূরা বাকারা, সূরা নম্বর ২, আয়াত ১৯৯], যার অর্থ অনেকটা এইরকম: "হজ্জের মাসগুলো সুবিদিত/সুনির্দিষ্ট"।

[সাইডনোট: কুরাইশরা ইসলামের আগে তাদের সুবিধা মতো মাস বদলিয়ে নিতো। সেই সময় যেহেতু কোনো দিন-ক্ষণের বালাই ছিল না, তারা তাদের ইচ্ছামতো মাস বদলাতো। তখনও পবিত্র চার মাসে যুদ্ধ নিষিদ্ধ ছিল, এর মধ্যে এক মাস হচ্ছে এই জুল-হিজ্জ্ব যেই মাসে হ্বজ পালন করা হতো। কিন্তু কুরাইশরা তা বদলিয়ে নিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করতো। কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা বলছেন [সূরা তাওবা, সূরা নম্বর ৯, আয়াত ৩৬-৩৭]:"নিশ্চয়ই আল্লাহ'র কাছে মাসের সংখ্যা বারো [যেভাবে তা লিখিত] আল্লাহর বইয়ে/বিধানে যেদিন তিনি আসমান সমূহ আর জমিন সৃষ্টি করেছেন - তার মধ্যে চারমাস পবিত্র। সেটাই সঠিক ধর্ম/জীবন বিধান। সুতরাং এদের [এই চারমাস] মধ্যে নিজেদের উপর জুলুম/অবিচার [যুদ্ধ] কোরো না। মুশরিকদের সাথে একসাথে যুদ্ধ করো যেমন তারা তোমাদের সাথে এক হয়ে যুদ্ধ করে আর জেনে রেখো আল্লাহ আছেন মুত্তাকীদের সাথে। প্রকৃতপক্ষে [এই চারমাসকে] থামিয়ে দেয়া/বদলানো অতিমাত্রায় অবিশ্বাস ছাড়া আর কিছুই না"]

কাজেই আরবি মাসের এই জুল-হিজ্ব মাসেই হ্বজ করতে হবে, সেটা গরম-ঠান্ডা যাই হোক না কেন। এরপর ইমাম কুরবানীর ঈদের এই সূচনা যে ইব্রাহিম (আঃ) আর তাঁর ছেলে ইসমাইল (আঃ)'র কুরবানীর পরীক্ষার স্মরণে সেটা আবার মনে করিয়ে দিলেন, ব্যাখ্যা করলেন। বললেন, ইব্রাহিম (আঃ) তাঁর সারা জীবন আল্লাহর বাধ্যতায় কাটিয়েছেন। এরমধ্যে তিনি তিনটা বড় বড় পরীক্ষা দিয়েছিলেন। যার সবগুলোই ছিল আল্লাহর বাধ্যতার চরম প্রমাণ। প্রথম পরীক্ষা ছিল তিনি যখন সব গুলো মূর্তি ভেঙে তাঁর বাবা-সহ বাকিদের রোষানলে পড়লেন, শাস্তি স্বরূপ বিরাট আগুনের কুণ্ডলী বানিয়ে তাঁকে সেটাতে ঢিল মেরে ছুড়ে ফেলা হলো, সেই অবস্থায় তিনি বললেন "আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট"। এরপরের পরীক্ষা: যখন আল্লাহ তাঁকে আদেশ করলেন তাঁর স্ত্রী বিবি-হাজেরা আর সন্তান ইসমাইল (আঃ) কে জনমানবশূন্য, খাবার-পানি বিহীন মক্কার মরুতে রেখে আসতে। ইব্রাহিম (আঃ) সেটা পালন করলেন। বিবি হাজেরাও আল্লাহর বিধান মেনে নিয়ে নাকি বলেছিলেন আল্লাহ তা'য়ালাই তাঁর আর তাঁর সন্তানের দেখভাল করবেন। এরপরের কাহিনী আমরা সবাই জানি, বিবি হাজেরা সাফা-মারওয়া পাহাড়ে পানির সন্ধানে দৌড়ালেন, আর পরে ফিরে এসে দেখলেন ইসমাইল (আঃ)'র কাছেই কাকতালীয় ভাবে জমজম ঝর্ণা/কুয়া থেকে পানি বের হচ্ছে। আর তৃতীয় বড় পরীক্ষা ছিল: যখন ইব্রাহিম (আঃ) তিন-তিনবার স্বপ্নে দেখলেন তিনি তাঁর ছেলেকে কুরবানী দিচ্ছেন। নবীদের স্বপ্ন ওহী। আর তাই, ছেলের সাথে পরামর্শ করেই তিনি সেটা পালন করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এরপর আল্লাহ তা'য়ালা ইসমাইলকে (আঃ) পশু দিয়ে পরিবর্তন করিয়ে দিলেন, আর ঘোষণা করলেন ইব্রাহিম (আঃ) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।

ইমাম বললেন, এইভাবেইব্রাহিম (আঃ) পরে আবার আদিষ্ট হলেন তাঁর ছেলেকে নিয়ে মক্কায় কাবাঘর তৈরী করতে। তিনি সেটা করলেন আর তার পর থেকেই মানুষ কাবাকে ঘিরে হ্বজ পালন করে আসছে। আল্লাহর দাসত্ব মেনে নিয়ে, তাঁর আদেশ বার বার পালন করার পরও এই কাবাঘর তৈরী করার সময় ইব্রাহিম (আঃ) আর ইসমাইল (আঃ) কি দোয়া করলেন? কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা রাসূল (সাঃ) কে বলছেন [সূরা বাকারা, সূরা নম্বর ২, আয়াত ১২৭]: এবং [স্মরণ করুন] যখন ইব্রাহিম ঘরের [কাবার] ভিত্তি তুলছিলেন, ইসমাইলকে নিয়ে, [আর বলেছিলেন] ও আমাদের রব, কবুল করুন আমাদের থেকে [এই কাজ], নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।"

এইসব ঘটনা থেকে আমাদের কী শিক্ষণীয়? ইমাম বললেন, আল্লাহ'র আদেশ যেখানে সুস্পষ্ট সেখানে আমরা আল্লাহ'র শিখিয়ে দেয়া উপায়ে বলবো [সূরা নিসা, সূরা নম্বর ৪, আয়াত ৪৬]: সামি'না ওয়া আতো'না, অর্থাৎ আমরা শুনলাম, এবং মানলাম। ইব্রাহিম (আঃ), বিবি হাজেরা আর ইসমাইল (আঃ)-এর কাহিনী আর হজ্ব থেকে এটাই আমাদের শিক্ষণীয় হওয়া উচিত। আর হজ্জ্বে গিয়ে যখন হাজ্জিরা বলেন: "লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক" - আমি হাজির, ও আল্লাহ আমি হাজির - তখন পক্ষান্তরে তাঁরা এই ঘোষণাই দিতে থাকেন।

এরপর ইমাম একটা দারুণ কথা বললেন। আমাদের প্রতিদিন এই "সামি'না ওয়া আতো'না, অর্থাৎ আমরা শুনলাম, এবং মানলাম" - এই কাজটা করার সুযোগ আছে। আমরা যখন নামাজের জন্য আজান শুনতে পাই, যখন আজানে বলা হয়:"হাইয়া 'আলাস সালাহ, হাইয়া 'আলাল ফালাহ", অর্থাৎ সালাতে ধাবিত হও, ভালোকাজে/সার্থকতায় ধাবিত হও - তখন যদি "আমরা শুনলাম, এবং মানলাম" - এই আয়াত চিন্তা করে তাড়াতাড়ি নামাজ আদায় করতে যাই, তাহলে আমরাও হাজ্জীদের মতো "লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক (আমি হাজির, ও আল্লাহ আমি হাজির)"- বলার সুযোগ পাচ্ছি।

[সবশেষ: নিজের জন্য রিমাইন্ডার, অন্য কারো উপকারে যদি আসে: একটা হাদিস শুনেছি, কেউ যদি ইচ্ছাকৃত ভাবে পর পর ৩ জুমআ বাদ দেয়, আল্লাহ নাকি তাঁর হৃদয় মোহর মেরে দেন, অর্থাৎ তার হৃদয় তখন মৃত। আরো কঠিন একটা ব্যাপার হচ্ছে ফরজ নামাজ না পড়া। ইমাম আহমেদের মতে কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে, অলসতার কারণে নামাজ ছেড়ে দেয়, সে নাকি অবিশ্বাসী বা কাফির হয়ে যায়। নামাজ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের রক্ষা করুন।]

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ