নেশাগ্রস্ত/মাতলামি আর নামাজের অর্থ

এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম ( ৫ জুন, ২০২৪): নেশাগ্রস্ত/মাতলামি আর নামাজের অর্থ
ইমাম নাসের চৌধুরী । মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি


ডিসক্লেইমার/ভূমিকা: আজকে শুক্রবার, আর লিখছি গত শুক্রবারের খুতবা। টাইটেল দেখেও হয়তো ভাবছেন এটা আবার কী রকম খুতবা। আসলেও তাই, খুতবাটা খুব ভালো ছিল, এইভাবে কোনোদিন ভেবে দেখি নাই। লিখবো ঠিক করে রেখেছিলাম। কিন্তু গত শুক্রবার সন্ধ্যায়ই আমাদের খালাতো ভাই, ইমরান ভাইয়ার স্ত্রী, জেরিন ভাবি অনেকদিন ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে শেষমেষ মারা গেলেন। বেচারি বেশ ভালো মনের মানুষ ছিলেন। সহজ সরল। আমাদের এতো সিনিয়র কিন্তু উনার সাথে আমরা ঠাট্টা, ফাজলামি কোনো কিছুই কম করতাম না। উনি কিছুই মনে করতেন না। একটা উদাহরণ দেই, প্রথম যখন উনার এতো বাজে স্টেজে ক্যান্সার ধরা পড়লো, সম্ভবত প্রায় তিন বছর আগে, আমরা ভেবেছিলাম এই শেষ, উনি আর বেশি দিন নাই। আমরা সবাই কুরআন খতম করে দোয়া করলাম। বেচারি খুবই খুশি হয়েছিলেন, কিন্তু পরে যখন উনি বেশ কয়েক বছর বেঁচে থাকলেন, আমাদের বাসায় একবার বেড়াতে আসলেন, আমি উনাকে মজা করে বলেছিলাম, এতোদিন টিকে থাকবেন আগে জানলে তো আমরা এতো কষ্ট করতাম না! যাইহোক, শেষে বেশ কষ্ট করছিলেন, আল্লাহ উনাকে নিশ্চয়ই এখন ভালো রাখবেন। সবাই উনার জন্য একটু দোয়া করবেন, প্লিজ। 


ইমাম বললেন, ইসলামের শুরুতে মদ খাওয়া হারাম ছিল না। সাহাবীরা মদ খেতেন, নামাজও পড়তেন। কিন্তু পরে একবার এক সাহাবী নামাজে মাতাল অবস্থায় উল্টা-পাল্টা সূরা তেলাওয়াত শুরু করলেন। সম্ভবত সূরা কাফিরুন পড়ার সময়। সূরা কাফিরুনের অর্থ যদি দেখেন, দেখবেন আল্লাহ তা'য়ালা রাসূল (সাঃ) কে বলতে বলছেন [সূরা কাফিরুন, সূরা নম্বর ১০৯, আয়াত ১-৩] যার অর্থ অনেকটা এইরকম: "বলুন হে কাফিররা, আমি ইবাদত করি না যা তোমরা ইবাদত করো, আর না তোমরা ইবাদতকারী যার আমি ইবাদত করি" -- এইরকম খুব কাছাকাছি উচ্চারণে পর পর আয়াত আছে। ওই সাহাবী সম্ভবত উল্টাপাল্টা করে বলে বসেছিলেন, আমি ইবাদত করি যা তোমরা ইবাদত করো (আস্তাগফিরুল্লাহ)। এরপর আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনের আয়াত নাজিল করলেন [সূরা আন-নিসা, সূরা নম্বর ৪, আয়াত ৪৩], যার অর্থ অনেকটা এইরকম: "হে যারা ঈমান এনেছো, তোমরা সালাতের কাছে যেও না যখন তোমরা নেশাগ্রস্ত থাকবে যতক্ষণ না পর্যন্ত তোমরা বুঝতে পারছো [সালাতে] যা বলছো"। পরে মদ খাওয়া পুরাপুরি হারাম করা হয়। 

ইমাম খেয়াল করতে বললেন, এই আয়াতে আল্লাহ তা'য়ালা নেশাগ্রস্ত/মাতাল অবস্থায় সালাতের "কাছে" যেতেও না করছেন। কারণ কি? সালাতে কী বলা হচ্ছে সেটা "বুঝতে" হবে। এরপর ইমাম বললেন, তারমানে বোঝা যাচ্ছে সালাতে কী তেলাওয়াত করা হচ্ছে সেটা বোঝা কতটা জরুরি। এরপর ইমাম প্রশ্ন করলেন, আমরা কী নেশা না করেও সালাতে কী তেলাওয়াত করি, সেটা বুঝি?

এরপর ইমাম বললেন, দুই ধরণের ফরজ আছে, ফরজে-আইন, আর ফরজে-কিফায়া: প্রথমটা ব্যক্তিগত ভাবে ফরজ, যেমন ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, আর দ্বিতীয়টা সমষ্টিগত ভাবে ফরজ, যেমন মৃত মুসলিমের জন্য নামাজে জানাজা পড়া। দ্বিতীয়টা সমাজের কেউ করলেই বাকিদের আদায় করা হয়ে যায়, সবার যে করতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নাই।  আরবি শিখে কুরআন বোঝা, ইসলাম শিক্ষা করা ফরজে-কিফায়া: সমষ্টিগত ফরজ। সবার করতেই হবে এমন না। সবাই পারবেও না। কিন্তু সূরার অর্থ বোঝার জন্য আরবী শিখতেই হবে এমন কোনো দরকার নাই। ইমাম বললেন, আজকের ইন্টারনেট আর গুগলের যুগে কেউ চাইলেই নামাজের সূরার অর্থ জানতে পারবে। না জানার কোনো অজুহাত আসলে কেউ দিতে পারবে না। 

ইমাম আরো মন্তব্য করলেন, দুনিয়ার জীবনে আমাদের অনেক সময় অনেক বাধা আসে, বাচ্চাদের স্কুল ভালো না, পড়া হচ্ছে না - ইত্যাদি। তখন আমরা নিজেদের উদ্ভাবনী চিন্তা দিয়ে খুবই চমৎকারভাবে সেগুলো কাটিয়ে উঠি। অনলাইনে পড়িয়ে, অন্য বই ব্যবহার করে কিছু একটা উপায় বের করি। একইভাবে নামাজের তেলাওয়াত করা সূরার অর্থ, রুকু-সেজদায় কী বলি - ইত্যাদির অর্থ জানার জন্যও আমাদের উদ্ভাবনী চিন্তা কাজে লাগিয়ে একটা উপায় বের করতে হবে। দরকার শুধু এর গুরুত্ব উপলব্ধি করা। 


সবশেষ: নিচে দুইটা রিসোর্সের লিংক দিচ্ছি যা দিয়ে আমি খুব উপকৃত হয়েছি। কারো কাছে অন্য কোনো লিংক বা রিসোর্স থাকলে কমেন্টে জানানোর অনুরোধ থাকলো। 

কুরআন ডট কম: এই ওয়েবসাইটে গিয়ে সেটিংসে গিয়ে বাংলা সেট করলে বাংলা শব্দার্থে পুরা কুরআন দেখা যায়: https://quran.com/

ওমর-আল-জাবিরের তৈরী করা ওয়েবসাইট: https://oazabir.github.io/QuranApp/  
কিছু পরিচিত সূরার শব্দার্থে বাংলা অনুবাদ: https://quraninbanglawords.wordpress.com/

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ