এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৪): সূরা বুরুজের তাফসীরের সমসাময়িক ঘটনা

এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৪): সূরা বুরুজের তাফসীরের সমসাময়িক ঘটনা
ফাইজান সায়েদ । মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি


ইমাম শুরু করলেন এই বলে যে, দুনিয়াতে এখন মুসলিমদের উপর এতো এতো নিপীড়ন হচ্ছে, গাজাতে, চীনের উইগুরে, মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের উপর সহ আরো অনেক জায়গায়, এতসব দেখে আমাদের অনেকের মনে হয়তো প্রশ্ন আসে, আল্লাহ তা'য়ালা কী এইসব দেখছেন না? আমাদের যাদের ঈমান দুর্বল, তারা হয়তো ভাবি, এই অন্যায়ের কী আদৌ কোনো বিচার হবে? এরপর ইমাম বললেন, এইসব ঘটনা আমাদের কুরআনে ফিরে গিয়ে এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর খুঁজতে উদ্বুদ্ধ করবে। বললেন, সূরা বুরুজ [সূরা নম্বর ৮৫] ও এর তাফসীর পড়লে আমরা দেখবো এইসব প্রশ্নের উত্তর সেখানে আছে। এরপর ইমাম পুরা খুতবায় মূলত সূরা বুরুজের মোট ২২ আয়াতের এক, এক করে আয়াত বললেন, আর তার সংক্ষিপ্ত আলোচনা করলেন। আমি নিচে খুতবার লিংক দিয়ে দিচ্ছি, কেউ ২৪ মিনিটের সেই ভিডিও দেখে নিলেই সবচেয়ে ভালো হবে। তারপর'ও আমি যতটুকু মনে আছে, সেটাই সংক্ষেপে লিখছি। আর সবশেষে ইমাম উনাদের একটা ইনিশিয়েটিভ এর কথা বললেন, সেটার লিংক, রেফারেন্স দিয়ে দিবো, ইনশাআল্লাহ। 

ইমাম বললেন, কল্পনা করুন রাতের অন্ধকারে আপনি তারা খচিত আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। সূরা বুরুজের প্রথম আয়াতে আল্লাহ বলছেন [সূরা বুরুজ, সূরা নম্বর ৮৫, আয়াত ১]: "শপথ সেই গ্রহ নক্ষত্র খচিত আকাশের"; এরপর আল্লাহ তা'য়ালা আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন কেয়ামত দিনের, [সূরা বুরুজ, সূরা নম্বর ৮৫, আয়াত ২]: "আর সেই প্রতিশ্রুত দিনের"। এরপর সাক্ষী আর যার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেয়া হবে তাদের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করে আল্লাহ তা'য়ালা বলছেন, [সূরা বুরুজ, সূরা নম্বর ৮৫, আয়াত ৩]: "আর সাক্ষী আর সাক্ষ্যের"। এরপর আল্লাহ তা'য়ালা কেয়ামতের দিন এক বিচার সভার কথা বলছেন। যেই ঘটনার বিচার হচ্ছে, সেই ঘটনা অনেকটা এইরকম: অনেক নারী-পুরুষ-শিশুকে এক খোলা ময়দানে জড়ো করে, বিরাট এক গর্তে ফেলে সেখানে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল! যারা তা করেছে তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালা বলছেন, [সূরা বুরুজ, সূরা নম্বর ৮৫, আয়াত ৪]: "গর্তের অধিকর্তারা অভিশপ্ত/ধ্বংসপ্রাপ্ত"। [যারা করেছে, তাদেরকেও একইভাবে জাহান্নামের আগুনে ফেলা হবে]। সেই গর্তের আগুনের জ্বালানি ওই মানুষগুলো: [সূরা বুরুজ, সূরা নম্বর ৮৫, আয়াত ৫]: "প্রজ্জলিত আগুনের ইন্ধন"।

ইমাম বললেন, আজকে গাজায় একইভাবে বোমা ফেলে মানুষদের জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। আর অনেকেই তা দেখছে কিন্তু তা বন্ধ করতে কিছুই করছে না। এরপর আবার ইমাম সূরা বুরুজের রেফারেন্স দিলেন, ওই নিরপরাধ নারী-পুরুষ-শিশুকে যেইভাবে পোড়ানো হচ্ছিলো, আর বাকিরা তা দেখছিলো, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালা বলছেন: [সূরা বুরুজ, সূরা নম্বর ৮৫, আয়াত ৬-৭]: "যখন তারা [গর্তের ] পাশে বসেছিল। আর মু'মিনদের সাথে কী করা হচ্ছিল তা দেখছিলো/তার সাক্ষী ছিল"। ইমাম বললেন, মানুষের এই কষ্টে তাদের কোনো ভাবান্তর ছিল না। কারণ তারা তাদেরকে মানুষ বলেই গণ্য করে নাই। একইভাবে আজকেও গাজার মানুষদেরকে 'মানুষ' হিসাবে গণ্য করছে না। আর তাই তাদের এই দুর্ভোগ-কষ্টে এদের কিছুই যায়-আসে না। এইসব দেখে আবার অনেকেই হয়তো আমরা ভাবি, নিশ্চয়ই গাজাবাসি, মুসলিমরা কোনো অন্যায় করেছিল, আর না হলে তাদের সাথে এইরকম অমানুষিক আচরণ কেন করা হচ্ছে? এর উত্তর, ওদের ডিফেন্ড করতে আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনেই বলে দিয়েছেন: [সূরা বুরুজ, সূরা নম্বর ৮৫, আয়াত ৮]: "তারা তাদেরকে নির্যাতন করছিলো একমাত্র এই কারণে যে তারা এক আল্লাহতে ঈমান/ বিশ্বাস এনেছিল, যিনি পরাক্রান্ত, প্রশংসিত।"  এরপরের আয়াতে আল্লাহ বলছেন, [সূরা বুরুজ, সূরা নম্বর ৮৫, আয়াত ৯]: "যার কাছেই আসমানসমূহের আর এই জমিনের রাজত্ব, তিনি সবকিছুইর প্রত্যক্ষদর্শী "। ইমাম মন্তব্য করলেন, ফিলিস্তিন কার? ফিলিস্তিনিদের, ইহুদিদের নাকি তার আগে ফিলিস্তিন জয় করা সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর নাকি তারও আগে কর্তৃত্ব করা ক্রুসেডারদের - এইসব বিতর্ক আল্লাহ তা'য়ালা এই এক আয়াতেই মীমাংসা করে দিয়েছেন। ফিলিস্তিনসহ পুরা পৃথিবীর রাজত্ব শুধুমাত্র এক আল্লাহ'র। 

এই আয়াতে আল্লাহ তা'য়ালা আরো বলছেন, তিনি সব কিছুর প্রত্যক্ষদর্শী। যে যা অন্যায় করছে, সব কিছুই তিনি দেখছেন। এর পরের আয়াতে আল্লাহ বলছেন, [সূরা বুরুজ, সূরা নম্বর ৮৫, আয়াত ১০]: "নিশ্চয়ই সেদিন বিশ্বাসী পুরুষ, বিশ্বাসী নারীদেরকে যারা নিপীড়ন করেছিল, আর পরে তাওবা করে নাই - তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি, আর আগুনে দগ্ধ হওয়ার যন্ত্রনা "। ইমাম খেয়াল করিয়ে দিলেন, আল্লাহ তা'য়ালা এতোই দয়াময় যে জালিমদেরকেও তওবা করে মাফ পাওয়ার সুযোগ তিনি এই আয়াতে দিয়ে রেখেছেন। আর যাদের নিপীড়ন করা হলো, তাদের সুসংবাদ দিয়ে বলছেন, [সূরা বুরুজ, সূরা নম্বর ৮৫, আয়াত ১১]: "আর যারা ঈমান এনেছে, আর সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার পাদদেশে নহর বয়ে চলেছে, সেটাই বিরাট সাফল্য"। ইমাম মন্তব্য করলেন, গাজাতে আক্রান্ত, সব হারিয়ে নিঃস্ব মানুষ আহাজারি হয়তো করে, কিন্তু খেয়াল করে দেখতে বললেন, কেউ কিন্তু আল্লাহ'র বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করে না। কারণ, তারা সত্য উপলব্ধি করে ফেলেছে। তাদের প্রতি অন্যায়ের ব্যাপারে সান্তনা দিয়ে আল্লাহ আরো বলছেন, [সূরা বুরুজ, সূরা নম্বর ৮৫, আয়াত ১২]: "নিশ্চয়ই তোমার রবের পাকড়াও অতি কঠিন"। ইমাম বললেন, অনেকে হয়তো ভাবে,  মৃত্যুর পরে আবার কিভাবে তারা পাকড়াও হবে, এর উত্তর এর পরের আয়াতেই আল্লাহ তা'য়ালা  দিয়েছেন, [সূরা বুরুজ, সূরা নম্বর ৮৫, আয়াত ১৩]: "নিশ্চয়ই তিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, পুনরাবৃতি [মৃত্যুর পর আবার জীবিত] করবেন " - কাজেই অন্যায় করে কারো পার পাবার উপায় নেই। 

এর পরের আয়াত আয়াত গুলোতে আল্লাহ তা'য়ালা বলছেন, [সূরা বুরুজ, সূরা নম্বর ৮৫, আয়াত ১৪ - ১৬]: "এবং তিনি গাফুর (ক্ষমাশীল), আর-রহীম (পরম দয়ালু), আরশের অধিপতি, আল-মাজিদ (সর্বোচ্চ সম্মানিত), যা করতে চান তাই করেন "। ইমাম বললেন, এরপর আল্লাহ তা'য়ালা অতীতের শত্রুদের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, [সূরা বুরুজ, সূরা নম্বর ৮৫, আয়াত ১৭-২০]: "আপনার কাছে কি সৈন্যবাহিনীর খবর পৌঁছেছে? ফিরাউন আর সামুদের? বরং কাফিররা (অবিশ্বাসীরা) মিথ্যারোপে রত। অথচ আল্লাহ ওদের অলক্ষে সবদিক থেকে ঘিরে রেখেছেন"। ইমাম বললেন, জালিম জাতিরা কোনোদিনই চিরস্থায়ী হয় নাই, ফিরাউন যেরকম সমুদ্রের পানি চারপাশ থেকে ঘিরে তারপরে ডুবে শেষ হয়েছে,  এক সময় আমাদের সময়ের জালিমদের একই পরিণতি হবে। এটা শুনে হয়তো জালিমদের কেউ কেউ বলে উঠতে পারে, কার এতো দুঃসাহস  আমাদের সাথে এইভাবে কথা বলে? আমরা তা মানি না। এর উত্তরে আল্লাহ তার পরের আয়াতেই আবার বলছেন, [সূরা বুরুজ, সূরা নম্বর ৮৫, আয়াত ২১-২২] :"[ওরা অমান্য করলেও এই কুরআনের কোনো ক্ষতি হবে না], এটা সম্মানিত কুরআন, যা লাওহে মাহফুজ [ফলকে সুরক্ষিত]" 

[সবশেষ: খুতবার দ্বিতীয় অংশে ইমাম উনাদের প্রতিষ্টিত একটা প্রতিষ্টানের কথা বললেন। নাম "A Continuous Charity (ACC)"। এদের মূল আইডিয়া হচ্ছে আমেরিকাতে কলেজগুলোতে পড়ার অনেক খরচ। বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রী মোটা অংকের লোন নিয়ে পড়ে, পাশ করার বহু বছর পর পর্যন্ত সুদ সহ লোন পরিশোধ করে। যেটা দেখা যায়, তাদের মূল লোনের চেয়ে পরিমানে অনেক বেশি। তাঁদের এই প্রতিষ্ঠান মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের বিনা সুদে লোন দেয়।  আর ছাত্র-ছাত্রীরা সেই লোন শোধ করলে সেই টাকা আবার নতুন কোন ছাত্রছাত্রীর জন্য ব্যবহার হয়। তাদের এই প্রতিষ্ঠান ডোনেশন নেয়, [পরে জিজ্ঞেস করে জেনেছি], চাইলে কেউ লেগাসি ফান্ড তৈরী করে তার আপনজনের জন্যেও টাকা রাখতে পারে। ওয়াকফ ভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠান এখন পর্যন্ত অনেক ছাত্র-ছাত্রীকে বিনা সুদে লোন নিয়ে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে।যা কিনা প্রায় ৫ মিলিয়ন সুদ হিসাবে খরচ হওয়া টাকা বাঁচিয়েছে। প্রতিবছর এপ্লিকেশন জমা নিচ্ছে। এখন পর্যন্ত তাদের ফান্ডে ৯ মিলিয়ন ডলার আছে! আমি ওদের ওয়েবসাইটের লিংক নিচে দিয়ে দিচ্ছি। 

সবশেষ সবশেষ: বাংলাদেশে ঠিক এইরকম না হলেও, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া গরিব ছাত্র-ছাত্রীকে মাসিক বৃত্তি দেয় এইরকম একটা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে "মোরাল প্যারেন্টিং", এদের লিংকও দিয়ে দিচ্ছি, কেউ চাইলেই খুব কম খরচেই দুই-একজন ছাত্র-ছাত্রীর সদকায়ে জারিয়া হিসাবে উপকার করতে পারেন।]

সূরা বুরুজ: https://quran.com/85?translations=84%2C161
খুতবার লিংক: https://www.youtube.com/live/BTX8WhgMkQE?si=zYqMuN3rbYJzEBNe
ACC'র লিংক: https://acceducate.org/about-us/
বাংলাদেশী মোরাল প্যারেন্টিং'র ফেইসবুক পেইজ: https://www.facebook.com/MoralParenting

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ