শেখ ইউসুফ এস্টেস'র আলোচনা (১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৪): মূল আরবি আর অনুবাদের তফাৎ মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি
শেখ ইউসুফ এস্টেস'র আলোচনা (১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৪): মূল আরবি আর অনুবাদের তফাৎ
মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি
[ডিসক্লেইমার: এই লেখা এই শুক্রবারের খুতবার সারমর্ম না। গত রবিবার সন্ধ্যায় 'ফানি/মজার শেখ' খ্যাত ইউসুফ এস্টেস এই মসজিদে এসেছিলেন। তাঁর আলোচনা শুনতে রীম আর আমি গিয়েছিলাম। সেটা নিয়ে আজকে লিখবো। তার আগে বলি, প্রায় ১০ বছর আগে টেক্সাসে উনার এক আলোচনা শোনার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। খুবই চমৎকার আলোচনা ছিল। আমি উনাকে কাগজে লিখে একটা প্রশ্নও করেছিলাম, আমার প্রশ্ন ছিল, একটা হাদিস আছে যে সত্যিকার মুসলিম হতে হলে রাসূল (সাঃ) কে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতে হবে। এটা কী করে সম্ভব? এর উত্তরে তিনি বলেছিলেন উনি যখন নতুন মুসলিম হন, তখন উনারও নাকি এই একই প্রশ্ন ছিল, কিন্তু যত বেশি তিনি রাসূল (সাঃ)'র জীবিনী পড়েছেন, জেনেছেন - রাসূল (সাঃ) তাঁর উম্মতের জন্য, অর্থাৎ আমাদের জন্য কী কী ত্যাগ আর কষ্ট স্বীকার করেছেন, ইত্যাদি জেনেছেন - তখন তাঁর পক্ষে এই হাদিস বুঝতে আর অসুবিধা হয় নাই। রাসূল (সাঃ)'র জীবনী জানতে ইংরেজিতে অনূদিত একটা বই: A Sealed Necter -এর রেফারেন্স দিয়েছিলেন [আমি কিনেছিলামও, কিন্তু পড়ে শেষ করি নাই]। আমার মনে হয়েছিল রিভার্টেড মুসলিমদের দৃষ্টিভঙ্গি আসলে সবসময়ই একটু অন্যরকম হয়। এইবারেও আলোচনাটাও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। আরবি মূল শব্দে অর্থ আর তার অনুবাদে যে কী পরিমাণ তফাৎ হয়, আমাদের পরিচিত কিছু শব্দের উদাহরণে তিনি সেটার ব্যাখ্যা করলেন। প্রায় এক ঘন্টার আলোচনার মূল সারমর্ম লিখছি। নিচে ভিডিও রেকর্ডিং'র লিংক দিয়ে দিচ্ছি। বরাবরের মতো বলি, আমার লেখা না পড়ে কেউ সেই ভিডিওটা দেখে নিলেই সবচেয়ে ভালো হবে।]
শেখ ইউসুফ এস্টেস বললেন কুরআনের আয়াত গুলো কনটেক্সট উপর নির্ভর করে [অন্য বইয়ের মতো ধারাবাহিক না]। কোন ঘটনায়, কি পরিস্থিতিতে একটা আয়াত নাজিল হয়েছে, সেটা জানা সেই আয়াতের অর্থ বুঝতে খুবই জরুরি। এরপর একটা উদাহরণ দিলেন, সূরা বাকারার ১৮৯ আয়াতে [সূরা নম্বর ২, আয়াত ১৮৯] আল্লাহ তা'য়ালা রাসূল (সাঃ) কে বলছেন, যার অর্থ: "তারা আপনাকে চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, বলুন তা মানুষের জন্য সময় আর হজ্জের সময় নির্ধারণ করে "। এরপর ওই আয়াতে পরের অংশে আরবের একটা প্রচলিত ধারা ভেঙে দেয়া হয়েছে, ওরা হজ্জে যাওয়ার সময় ঘরের একদিক দিয়ে বের হতো, আর ফিরে এসে অন্যদিক দিয়ে প্রবেশ করতো। বলা হচ্ছে তাতে কোনো 'তাকওয়া' নেই। শেখ বললেন, এই আয়াতে কিন্তু শুধু প্রথমে একবারই হজ্জের কথা সরাসরি বলা হয়েছে। এর পরের ৪-৫ টা আয়াতও যে হজ্জের সময়কেই কেন্দ্র করে বলা হচ্ছে, সেটা কনটেক্সট থেকে বুঝতে হবে। শেখ ব্যাখ্যা করলেন, ইহরামের কাপড় পড়া অবস্থায় যুদ্ধ করা, কাউকে মেরে ফেলা নিষিদ্ধ, তাতে হজ্জ্ব বাতিল হয়ে যাবে এটা সবাই জানে। তার উপর, সেই সময়ের আরবদেরকে যুদ্ধ শেখানোর, কাউকে মেরে ফেলা শেখানোর কিছু ছিল না। এর পরের আয়াতে যে মুসলিমদের [মক্কা বিজয়ের আগে, হুদাইবিয়ার সন্ধির পর] হজ্জে যাওয়ার সময় কুরাইশদের সাথে কিভাবে আচরণ করতে হবে, তারা আক্রমণ করলে ইহরামের কাপড় পড়েও যে তাদের সাথে যুদ্ধ করা জায়েজ, তাদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে, তাদের সাথে মরণ যুদ্ধ/কিতাল করা যাবে, তাদের তাড়িয়ে দেয়া যাবে - ইত্যাদি বলা হচ্ছে, অনুমতি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এই আয়াত গুলার অনেক অনুবাদ করা হয়েছে এইভাবে: তাদের যেখানে পাও সেখানেই হত্যা করো! ইংরেজিতে slaughter বা slay শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। শেখ বললেন, এইটা মূল আরবির অর্থের সাথে মোটেও যায় না। আরবিতে জবাই করার শব্দ 'জাবিহা', 'কতল' না। আর এই আয়াতে 'কতল' করতে বলার অর্থ, হজ্জে বাধা দেয়া, বা আক্রমণ করা কুরাইশদের সাথে 'মরণ যুদ্ধ' করা। কিন্তু অনুবাদে যেভাবে অমুসলিমদের যেখানে পাও, তাদের হত্যা করো - এটা বলা হচ্ছে, সেটা মোটেও ঠিক না। শেখের মতে আরবি কুরআন প্রথমে ল্যাটিন ভাষায়, এরপর ল্যাটিন থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ হওয়ায় এই ইচ্ছাকৃত ভুল অনুবাদকরা করেছেন - যারা আসলে ইসলামের শত্রু।
শেখ এরপর 'ইসলাম' শব্দের অর্থ কী জিজ্ঞেস করায় উপস্থিত কেউ বললেন 'শান্তি', কেউ বললেন 'সাবমিশন' বা আল্লাহ'র ইচ্ছার আনুগত্য। শেখ ব্যাখ্যা করলেন, ঠিক আছে, কিন্তু সবগুলোই আংশিক কেননা, 'ইসলাম' শব্দের অর্থ আসল অর্থ নাকি কয়েকটি শব্দের মিশ্রণ: শান্তি, আনুগত্য, আত্মসমর্পণ, সিন্সিয়ারিটি, নিরাপত্তা, নিরাপদ। কোনো একটা বাদ দিয়ে এর অর্থ করলে হবে না। উদাহরণ দিয়ে বললেন, আরবরা যখন বিদায় নেয় তখন তারা নাকি বলে 'মা সালামা' - এইটা বিদায় নেয়ার সময় ছাড়া আর কোনো সময় বলে না। এর অর্থ কি? উপস্থিত এক আরব উত্তরে বললেন, এর অর্থ অনেকটা 'আপনি নিরাপদে, নিরাপত্তায় থাকুন', কিন্তু শান্তিতে থাকুন - তা কিন্তু না। অর্থাৎ ইসলাম শব্দের মূল অক্ষরের এই 'সালামা' নিরাপত্তা, নিরাপদে থাকাও বোঝায়। কাজেই 'ইসলাম' মানে শুধু শান্তি না।
এরপরের শব্দ বললেন, 'ইক্বরা' - যেটা আমরা সবাই জানি যে প্রথম নাজিলকৃত আয়াতের প্রথম শব্দ। এর অর্থ কি জিজ্ঞেস করায় কেউ বললেন 'পড়ো'! শেখ বললেন, এই অর্থ ভুল। 'ইক্বরা' শব্দের অর্থ আসলে কিরাআত করো, ইংরেজিতে recite, অর্থাৎ এইখানে পড়তে বলা হয় নাই। আমাদের রাসূল (সাঃ) নিরক্ষর ছিলেন, তিনি পড়তে পারতেন না। কাজেই তাঁকে পড়তে বলার কারণ নেই, কিরাআত করতে বলা হয়েছে। ইমাম আরো উদাহরণ দিলেন, রোজা মাসে যে ইমাম কুরআন খতম দেন, তাঁকে কি বলা হয়? ক্বারী। চিন্তা করে দেখতে বললেন, তিনি কি তারাবিতে কুরআন পড়ছেন, না কিরাআত করছেন? আরো উদাহরণ দিলেন, জন্মান্ধ কোন ব্যক্তি যে পড়তে পারে না, সেও কিন্তু কুরআন মুখস্ত করে কিরাআত করতে পারে। জন্মান্ধ কিন্তু কুরআনে হাফেজ আছেন না? কাজেই, 'ইক্বরা' শব্দের অর্থ 'পড়ো' বললে ভুল হবে!
এরপর জিজ্ঞেস করলেন, 'দ্বীন' শব্দের অর্থ কি? কেউ বললেন ধর্ম, একটু বললেন জীবনব্যবস্থা। শেখ বললেন ধর্ম বা religion 'র অর্থ ডিকশনারি খুঁজলে আমরা দেখবো সেটার অর্থ লেখা আছে প্রভু বা প্রভুদের উপর বিশ্বাস এবং উপাসনা করা। অর্থাৎ, বহুবচনে আছে। কাজেই দ্বীন শব্দের অর্থ আসলে ধর্ম না, বরং 'জীবনব্যবস্থা' হওয়া উচিত।
এরপর জিজ্ঞেস করলেন 'তাক্বওয়া' শব্দের অর্থ কী? কেউ বললেন আল্লাহকে ভয়, কেউ বললেন আল্লাহ চিন্তা থাকা, আল্লাহ আমাদের দেখছেন - এইটা বিশ্বাস করা ইত্যাদি। শেখ বললেন, এই অর্থ গুলো ভাবার্থে ঠিক আছে, কিন্তু 'তাক্বওয়া'র আসল অর্থ হিসাবে ঠিক নাই। এরপর বললেন, তাক্বওয়া শব্দের সঠিক অর্থ হবে 'ঢাল'। আপনার আর অন্য কিছুর মধ্যে ঢাল। এরপর সূরা ফাতেহার গাইরুল মাগদূবি - আয়াতের 'গদব' শব্দের রেফারেন্স টেনে বললেন, এই গদব [বা বাংলায় গজব] শব্দের অর্থ অনেকে অনুবাদ করেন "আল্লাহর রাগ" হিসাবে। কিন্তু শেখ একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝালেন যে সেটাও ঠিক না। উদাহরণ দিলেন, ধরা যাক, রাস্তায় কেউ আপনাকে থামিয়ে পাশ থেকে আপনার সামনে চলে আসলো, অথবা আপনি পোস্ট অফিসের লাইনে দাঁড়ানো আছেন, কেউ পরে এসে মাঝখানে ঢুকে পড়লো - আপনার প্রচন্ড রাগ হবে। কিন্তু আপনি হয়তো কিছুই করবেন না। কিন্তু ধরা যাক, রাস্তায় কেউ পাশকাটিয়ে সামনে চলে এসে থেমে গেলো, আর পেছনেরজন এতোই খেপে গেলো যে সে তার গাড়ির ট্রাঙ্ক খুলে রেঞ্চ নিয়ে এসে সামনের ওই লোকের গাড়ির গ্লাস ভাঙা শুরু করে দিলো - অর্থাৎ, সে শুধু রাগেই নাই, বরং সে ঐব্যাপারে কিছু একটা করে বসলো - এইটাই গদব বা ইংরেজিতে যাকে wrath বলে। আর আল্লাহ তা'য়ালাও যারা ঠিকমতো আচরণ করে না, তাদের ব্যাপারে কিছু একটা করবেন, তাদের উপর তাঁর গদব [বা বাংলায় গজব] পড়বে। আর সেই হিসাবে 'তাক্বওয়া' হচ্ছে আল্লাহ তা'য়ালার সেই গদব আর আমাদের মধ্যে ঢাল।
এইবার জিগ্গেস করলেন, 'সালাহ'/সালাত' শব্দের অর্থ কী? মজা করে বললেন, এতক্ষনে নিশ্চয়ই আপনারা বুঝে গেছেন যেহেতু তিনি জিজ্ঞেস করছেন, তার মানে সচরাচর সালাতের যেই অর্থ আমরা করি সেটা আসলে এর অর্থ না। তাও জিজ্ঞেস করলেন আর উত্তরে কেউ বললেন prayer বা উপাসনা করা। শেখ বললেন, না! সালাহ শব্দের সঠিক অর্থ হচ্ছে Connection বা সংযোগ স্থাপন করা । আরবিতে prayer বা উপাসনার শব্দ কি সেটা আমরা সবাই জানি, আর সেটা হচ্ছে 'দো'আ'। দো'আ শব্দের অর্থ ডাকাও হয়। আমরা ওযু করে পবিত্র হই, কেবলা মুখী হয়ে, রাসূল (সাঃ) শিখিয়ে দেয়া পন্থায় সালাতে দাড়াই, প্রথমে আল্লাহর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করি আর তারপর দো'আ করি, তাঁকে ডাকি। আমাদের বিভিন্ন প্রয়োজন তাঁকে জানিয়ে তাঁর সাহায্য চাই।
[সবশেষ: ১০ বছর আগে শেখ ইউসুফ এস্টেসকে দেখেছিলাম, এইবার দেখে একটু খারাপই লাগলো। বয়স হয়ে গেছে, কানেও কম শোনেন। আগের চেয়ে শুকিয়েও গেছেন। উনার সাথে উনার ছেলে ছিল, যিনি কিনা সব রেকর্ডিং করলেন। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে উনাকে যে পানির বোতল দেয়া হলো, সেটার লেবেল খুলে সামনে রাখলেন আর শেখ বললেন, উনি কোনো ব্রান্ডের এডভার্টাইসমেন্ট করছেন - লোকে সেটা ভাবুক, সেটা উনি চান না। শেখ উনার ইসলামের 'দাওয়া' প্রোগ্রামের জন্য সম্ভব হলে ডোনেট বা দান করতে বললেন, আর বললেন বেশি বেশি করে দোয়া করতে। আমার দেখে মনে হয়েছে উনি আর্থিক ভাবে কষ্টে আছেন। আমি উনার Guide US TV ওয়েবসাইটে গেলাম, সেটারও অবস্থা খারাপ। ওয়েবপেইজ লোড হতে অনেক সময় লাগলো। সত্যি বলতে উনার এই লেকচারের রেকর্ডিং খুঁজে পেতে আমার বেশ কষ্ট হয়েছে। যাইহোক, আমি নিচে লেকচারের রেকর্ডিং'র লিংক দিচ্ছি, ভিডিওতে অবশ্য আমিও আছি! এই লেখা লেখার সময় ইজিয়ান, মানারা ভিডিওতে আমাকে দেখে খুব মজা পেয়েছে।আলহামদুলিল্লাহ]
লেকচারের লিংক: https://www.facebook.com/share/v/xJmD85tuCbXdaZc6/
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন