এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (৪ অক্টোবর, ২০২৪): সূরা আসর বা সময়ের গুরুত্ব

এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (৪ অক্টোবর, ২০২৪): সূরা আসর বা সময়ের গুরুত্ব 
ইমাম নেসার চৌধুরী । মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি

[ডিসক্লেইমার: এই শুক্রবারের খুতবার সারমর্ম লিখবো খুব সংক্ষেপে, তারপরে লিখবো গত রাতের 'খাতারা''র প্রসঙ্গে।  মূলত সেটা লেখার জন্যই লিখতে বসছি। ড. শাদী এলমাসরি আলোচনাটা করলেন। উনাকে এর আগে ইউটুবে আর ইয়াকীন ইনস্টিটিউটের আলোচানায় দেখছি। সত্যি বলতে আমি উনার নাম জানতাম না। কিংবা জানলেও ভুলে গিয়েছিলাম। বাসায় এসে ইন্টারনেটে একটু ঘেঁটে উনার নাম বের করলাম। উনি যে নিউ জার্সিতে জন্ম নেয়া, বড় হওয়া আলেম জেনে ভালো লাগলো। বড়োজোর পাঁচ মিনিট কথা বললেন, কিন্তু কম কথায় কী অদ্ভুত গভীরতা! আফসোসের ব্যাপার, ভিডিও রেকর্ডিং নাই, থাকলে অবশ্যই শেয়ার করতাম। কী বলেছেন সেটা সবার জন্যই ইন্টারেষ্টিং হবে। আর ইয়াকীন ইনস্টিটিউটের ভিডিওটা শেয়ার করছি। ঐটা নিয়েও আমি লিখেছিলাম, মনে আছে। সেটার লিঙ্ক খুঁজে বের করে দিয়ে দিবো ইনশাআল্লাহ।]

ইমাম সূরা আসরের তাফসীর করলেন। বললেন সময় চলে যাচ্ছে। সময় নিয়ে একটা আরবি প্রবাদও বললেন, কে বলেছেন সেটা মিস করেছি, প্রবাদটা অনেকটা এইরকম: সময় ধারালো তরবারি/ছুরির মতো: একে তুমি না কাটলে, সে তোমাকে কেটে চলে যাবে! এরপর বললেন, সময় এতটাই মূল্যবান যে যে যতদিন বাঁচবে, সে তত ভাগ্যবান, কিন্তু শর্ত হচ্ছে সময় কাজে লাগাতে হবে। এরপর একটা হাদিস/গল্প বললেন যেটা অনেকটা এইরকম: মদিনায় ৩ বেদুইন লোক ইসলাম গ্রহণ করে রাসূল (সাঃ)'র সাথে বিভিন্ন অভিযানে যেতে চাইলেন। কিন্তু তাদের কোনোই সামর্থ নাই। কোনো টাকা-পয়সা, অস্ত্র নাই। রাসূল (সাঃ) তাঁর সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করলেন কেউ কী আছো যে এই তিন জনের দায়িত্ব নিতে পারবে? কোনো এক সাহাবী [সম্ভবত আনসারী, আমার নাম মনে নাই] তাদের দায়িত্ব নিলেন। এরপর সেই সাহাবীর ঘর থেকেই এরা একেক সময় অভিযানে গেলেন। তাদের তিনজনের মধ্যে দুইজনের অভিযানে/যুদ্ধে মৃত্যু হলো, আরেকজন অনেকদিন বেঁচে ছিলেন, যার পরে স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। পরে তাদের আশ্রয় দেয়া সেই সাহাবী এক স্বপ্নে দেখলেন মৃত্যুর পর শহীদ হওয়া প্রথম দুইজনের থেকে তৃতীয়জন বেশি সম্মানিত হচ্ছেন। এই ব্যাপারটা তাঁকে পীড়া দিলে, সেটা  নিয়ে রাসূল (সাঃ) কে  জিজ্ঞেস করলে রাসূল (সাঃ) নাকি বলেছিলেন, এটাতে অবাক হওয়ার কী আছে, যে বেশিদিন বাঁচলো, আর বেশি সময় আল্লাহর ইবাদতে সময় কাটালো, সে তো বেশি  সন্মানিতই হবে!

এরপর ইমাম বললেন, এখানে মূল বিষয় হচ্ছে সময় কাজে লাগানো। মন্তব্য করলেন, আফসোসের বিষয় এখন সময় নষ্ট করাটাকে উৎসাহিত করা হয়। কিছু না করে বসে থাকাটা যেন ভালো! আরো মন্তব্য করলেন, একজন সত্যিকার মুসলিমের অবসর নাই, কিছু না করে বসে থাকলেও সে 'ইস্তেগফার' করবে  কিংবা 'সুবহানাল্লাহ' বলবে। ইমাম আরো বললেন, আমরা হয়তো ভাবছি এতো ব্যস্ততায় আল্লাহ'র ইবাদতে সময় দিবো কিভাবে? কিন্তু ইমাম ব্যাখ্যা করলেন, আমাদের দৈনন্দিন "কাজ" যদি আল্লাহকে খুশি করার জন্য হয়, তাহলে সেগুলাও ইবাদত। বললেন, কেউ বেশি বেশি কাজ করছে, কিন্তু তাঁর নিয়ত যদি হয় সেই কাজের মাধ্যমে বেশি উপার্জন করে সেখান থেকে তার পরিবারকে সাহায্য করবে, গরিব-দুঃখীকে সাহায্য করবে, আল্লাহ'র রাস্তায় খরচ করবে, তাহলে সেই কাজও ইবাদত। 

ড. শাদী এলমাসরির গতরাতের 'খাতারা' [আমি তাঁকে ইমাম হিসেবেই লেখায় সম্বোধন করছি]
----------------------------------------------

প্রথমেই "আমি একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি" বলে মাইকের স্ট্যান্ড থেকে মাইকটা এক হাতে খুলে নিয়ে নিয়ে আরেক হাতে স্ট্যান্ডটা তুলে ধরে প্রশ্ন করলেন,  যারা আমরা আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী, তাদের যদি কেউ এসে এই স্ট্যান্ড দেখিয়ে বলে: তোমরা এক আল্লাহতে বিশ্বাস করো, আমিও করি, কিন্তু আমার কাছে এই স্ট্যান্ড/মূর্তি সেই একক সত্ত্বার প্রতিনিধি  -- তাহলে আমাদের বলার কী আছে? একত্ববাদে ধারণায় তার সাথে আমাদের পার্থক্য কোথায়? এরপরে উত্তরে বললেন, সেটার উত্তর আল্লাহ তা'য়ালা নিজেই কুরআনে দিয়েছেন 'তানজিহ' নামে পরিচিত একটা সূরায়, যেটা আমাদের অনেকের কাছে সূরা 'ইখলাস' [ক্বুল হুয়াল্লাহু আহাদ।..] নামে পরিচিত। বললেন,  আমাদের কাছে কেউ এসে এই প্রশ্ন না করলেও, রাসূল (সাঃ) কে এই প্রশ্ন করা হয়েছিল। আর আল্লাহ তা'য়ালা এর উত্তরে কী বলতে হবে, এই সূরায় রাসূল (সাঃ) কে শিখিয়ে দিচ্ছেন: [সূরা ইখলাস, সূরা নম্বর ১১২, আয়াত ১]: "বলুন, আল্লাহ এক অদ্বিতীয়" -- ইমাম বললেন, এই 'আহাদ' শব্দের অর্থ শুধু এক বা অদ্বিতীয় না - এটা আসলে বোঝায় সেই একক যার মধ্যে আর কোনো ভাগ নেই: যার শুরু কিংবা শেষ নেই। স্থান, কাল দিয়ে যাকে বাঁধা যায় না। এরপরে আয়াত: "আল্লাহুসসামাদ" আর - এই 'সামাদ' শব্দের অর্থ যার অন্য কোনো কিছুর প্রয়োজন নাই, অমুখাপেক্ষী। আর এই দুই আয়াতেই প্রথমে করা প্রশ্নের উত্তর আল্লাহ দিয়ে দিয়েছেন: আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর সৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। কাজেই সৃষ্টির কোনো কিছুই দিয়ে তাঁকে প্রতিনিধিত্ব করার প্রশ্নই আসে না। ইমাম আরো বললেন, এই  'আহাদ' -র মাধ্যমে হিন্দু ধর্মের বহু দেবতা আর খ্রিস্টানদের দাবি আল্লাহ একক সত্তা কিন্তু তিনি একের ভেতর 'তিন' - এই 'ট্রিনিটি'  ধারণাও খণ্ডন করা হয়েছে। 

এরপরের আয়াত "লাম ইয়ালিদ, ওলাম ইউলাদ", যার অর্থ অনেকটা এইরকম: "তিনি কাউকে জন্ম দেন না, আর তাঁকেও জন্ম দেয়া হয় নাই"। আর এর মাধ্যমে ঈসা (আঃ) আল্লাহর ছেলে এই দাবিকে বাতিল করে দেয়া হয়েছে। আর শেষ আয়াত: "ওলাম ইয়াকুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ" - যার অর্থ অনেকটা এইরকম: "তাঁর সমকক্ষ কেউই নয়" - এটা বলে আল্লাহকে কোনো কিছুর সাথেই যে তুলনা করা যাবে না, সেটা বলা হচ্ছে। আল্লাহকে কোনো কিছু দিয়ে 'কন্সেপচুয়ালাইজ' বা ধারণা করার ক্ষমতা আমাদের নাই। 

ইয়াকীন ইনস্টিটিউটে ড. শাদী এলমাসরির আলোচনা:
https://youtu.be/zwtGEPocd2A?si=zotUdZZ_9Z_xNVsL

সেই আলোচনা নিয়ে আমার আগের লেখা:
https://open.substack.com/pub/banglakhutba/p/fa4?r=1f44tc&utm_campaign=post&utm_medium=web
  

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ