হতাশ না হওয়া, ক্রিসমাস ট্রি, চ্যাট জিপিটি
এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৫ নভেম্বর, ২০২৪): হতাশ না হওয়া, ক্রিসমাস ট্রি, চ্যাট জিপিটি
ইমামের নাম জানি না । ইসলামিক সোসাইটি অফ সেন্ট্রাল জার্সি, নিউ ব্রান্সউইক টাউনশিপ, নিউ জার্সি
[ডিসক্লেইমার: "হতাশ না হওয়া, ক্রিসমাস ট্রি, চ্যাট জিপিটি" -- খুতবার টাইটেল মোটেও এটা ছিল না। সত্যি বলতে ইমাম খুতবায় বললেন তাঁর খুতবার কোনো টাইটেলে থাকে না। তিনি সাধারণত সবাইকে খুতবা শুনে নিজে থেকে সেটার টাইটেল ঠিক করতে বলেন। আর খুতবা ছাড়াও এই কয়েকদিনে ছোটখাট আরো কিছু লেকচার শুনেছি, ঘটনা ঘটেছে সেইগুলি লিখবো দেখেই ভাবলাম টাইটেল যখন দিতেই হবে, তাহলে এইটাই দেই। ইমামের খুতবা ছিল হতাশ না হওয়া নিয়ে, আর বাকি গুলো অন্য জিনিস। সংক্ষেপে লিখছি। আর বরাবরের মতোই বলছি: আমার শোনার, বোঝার ভুল হতে পারে, তাই লেখা নিজ দায়িত্বে পড়তে হবে, নিজে থেকে যাচাই করে নিতে হবে।]
*** খুতবার সারমর্ম: হতাশ না হওয়া ***
আমেরিকার নির্বাচনের পর এটাই সম্ভবত প্রথম জুমআর খুতবা। ইমাম বললে তাঁর নিজের কোনো সোশ্যাল মিডিয়া একাউন্ট নেই, তিনি সোশ্যাল মিডিয়া ফলোও করেন না। কিন্তু তিনি কিছু হোয়াটস্যাপ গ্রুপে আছেন, যেইগুলিতেও তিনি পারতপক্ষে মন্তব্য করেন না। কিন্তু মাঝে মাঝে অন্যরা এমন কিছু শেয়ার করলে, বা মন্তব্য করলে তখন তিনি চুপ করে থাকতে না পেরে কিছু বলেন। সেটা কী ছিল, বললেন না. শুধু বললেন তেমন একটা আলাপের কারণেই তিনি আজকের খুতবা দিচ্ছেন।
ইমাম প্রথমেই একটা ভুল শোধরালেন। বললেন, অনেকে মনে করেন ইমাম বা ধর্মীয় নেতারা শুধু আত্মিক, আধ্যাতিক (স্পিরিচুয়াল) বিষয় নিয়ে কথা বলবেন, রাজনীতি নিয়ে কথা বলার কী দরকার! ইমাম বললেন, ইসলাম শুধু একটা ধর্ম না, এটা একটা জীবনব্যবস্থা, আর রাজনীতি যেহেতু জীবনকে প্রভাবিত করে, কাজেই সেটা নিয়ে আলাপ করতেই হবে। ইমাম বলেন, সহীহ হাদিস আছে, যেখানে আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, রাসূল (সাঃ) নাকি বলেছেন: "ইসলাম শুরু হয়েছে অদ্ভুত হিসাবে, ফিরেও যাবে অদ্ভুত হিসাবে, কাজেই সুসংবাদ সেই অদ্ভুত ব্যক্তিদের জন্য"। ইমাম বললেন আরবে যখন রাসূল (সাঃ) ইসলাম প্রচার শুরু করলেন, তখন সেটা অনেকের কাছেই মাথাব্যথার কারণ ছিল। যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রথার বিপরীতে ছিল। শুরুতে রাসূল (সাঃ) মাত্র গুটিকয়েক সমর্থক ছিল, তাঁর চাচা আবু তালিব'র কাছে কুরাইশ নেতারা তো ঘুষ নিয়েও হাজির হয়েছিল যেন রাসূল (সাঃ) সেটার বিনিময়ে ইসলাম প্রচার বন্ধ করেন। তখন রাসূল (সাঃ) তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি দিয়েছিলেন, তাঁর (সাঃ) চাচাকে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার সম্বোধন করে যা বলেছিলেন সেটা ছিল অনেকটা এইরককম: ওরা যদি আমার ডান হাতে সূর্য, আর বাম হাতে চাঁদ এনেও দেয়, তাহলেও (আমি ইসলামের প্রচার) বন্ধ করবো না যতক্ষণ না আল্লাহ এটাকে বিজয়ী করেন আর না হয় একে রক্ষা করতে গিয়ে আমার মৃত্যু হয়।
ইমাম এরপর আরেকটা ঘটনা বললেন। এটা রাসূল (সাঃ)'র মৃত্যুর অনেক পরে, উমর (রাঃ)'র খেলাফতের সময়, জেরুজালেম বিজয়ের পর যখন রোমানদের কাছ থেকে জেরুজালেমের চাবি বুঝে নিতে মুসলিম সেনাপ্রধান আবু-উবাইদা, যিনি রাসূল (সাঃ)'র একজন সাহাবী ছিলেন, যখন উমর (রাঃ) কে মদিনা থেকে জেরুজালেম আসতে অনুরোধ করলেন, তখন উমর (রাঃ), আমিরুল মু'মিন হয়েও শুধু একজন ভৃত্যকে সাথে নিয়ে উটে চড়ে রওনা হোন। আসার পথে পালাক্রমে তিনি একবার উটে চড়েন, আর আরেকবার তিনি দড়ি ধরে উট টানেন আর তাঁর ভৃত্য তখন উটে চড়ে বসেন। এইভাবে যখন জেরুজালেমে পৌঁছান তখন ঘটনাক্রমে ভৃত্যের উটে চড়ার পালা, তাঁদের দুইজনেরই যাত্রার ধকলে কাপড়চোপড়ে ময়লা লেগে আছে। তখন আবু-উবাইদা (রাঃ) নাকি পরামর্শ দিয়েছিলেন, উমর (রাঃ) যেন বিশ্রাম নিয়ে, পরিষ্কার হয়ে, ভালো কাপড়-চোপড় পড়ে পরে জেরুজালেমে ঢুকেন। ইমাম মন্তব্য করলেন, আবু উবাইদার (রাঃ) উদ্দেশ্য মহৎ ছিল, রোমান সম্রাটদের চাকচিক্যের বিপরীতে পাল্লা দেওয়া না বরং মুসলিমদের 'ইজ্জত'/মান রক্ষার জন্যই তিনি হয়তো এই কথা বলেছিলেন। তখন উমর (রাঃ) নাকি তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি দিয়েছিলেন, তিনি বলেছিলেন আবু-উবাইদা ছাড়া অন্য কেউ এই কথা বললে তিনি আরো কঠিন উত্তর দিতেন, আর বলেছিলেন: নিশ্চয়ই আমরা আগে অসম্মানিত গোষ্ঠী ছিলাম, আর আল্লাহ আমাদের ইসলাম দিয়ে সম্মানিত করেছেন। আমরা যদি আল্লাহ আমাদের যা দিয়ে সম্মানিত করেছেন সেটা বাদে অন্য কিছুতে সন্মান খুঁজি, তাহলে আল্লাহ আমাদের অসম্মানিত করবেন।
ইমাম বললেন, আমরা যেন হতাশ হয়ে না পড়ি। এইসব ঘটনা থেকে সাহস আর ধৈর্য শিক্ষা নিয়ে যেকোনো পরিস্থিতিতে আল্লাহর উপর ভরসা করে আশা নিয়ে বেঁচে থাকি।
** ক্রিসমাস ট্রি **
নোমান আলী খানের এই লেকচারটাতে মুসা (আঃ) বনি-ইসরাইলদের ফিরাউনের হাত থেকে রক্ষা করে নিয়ে আসার পর, অনেক অনেক "মু'যেযা" বা অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী থাকার পরেও কিভাবে তারা 'সামেরী' নামের এক লোকের প্ররোচনায় স্বর্ণ দিয়ে বানানো এক বাছুরের প্রতিকৃতির পূজা করা শুরু করে দিয়েছিলো, কেনই বা করেছিল, সেটা নিয়ে আলাপ আছে। এই ঘটনা কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা উল্লেখ করেছেন। 'সামেরীর' নাম পর্যন্ত উল্লেখ করেছেন। কাজেই সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ আর আমাদের সেটা থেকে কী শিক্ষা নেয়া উচিত, সেটা এই আলোচনায় আছে।
বনি-ইসরাইলরা যুগ যুগ ধরে মিশরে দাস হিসাবে নিপীড়িত ছিল। অন্যদিকে মিশরীয়রা সভ্যতায়, শিক্ষায়, জ্ঞানে, স্থাপত্যে সেই সময়ে শ্রেষ্ঠ ছিল। তারা বহু দেব-দেবীতে বিশ্বাসী ছিল। গরু/গাভীর আকৃতিতে দেব-দেবী সহ আরো অনেক দেব-দেবীতে বিশ্বাস করতো। তারা বিশ্বাস করতো এইসব দেব-দেবীকে খুশি রাখলে, তার বিনিময়ে তারা সুরক্ষিত থাকবে, খরা, প্রাকৃতিক বিপদ-আপদ থেকে বাঁচবে। এইসব যুগ যুগ ধরে দেখতে দেখতে বনি-ইসরাইলিদের হয়তো মনে হতো এই মিশরীয়রাই ঠিক, তাদের আচার-আচরণ, কালচার এইগুলোই সঠিক, তা না হলে তো তারা এতো উন্নত হতো না! মুসা (আঃ) এসে যখন অনেক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী করে তাদেরকে শেষমেষ উদ্ধার করে মিশর থেকে বের করে নিয়ে আসেন, তখন তারা সেই সময়ের 'মুসলিম' ছিল। সবরকম পূজা আর মিশরীয় কালচার থেকে থেকে তাদের বের করে আনেন। আর তাদের হারুন (আঃ)'র দায়িত্বে রেখে আল্লাহর সাথে কথা বলতে মুসা (আঃ) একা পাহাড়ে যান, তখন 'সামেরী' নামের এক লোক, তাদের কাছে থাকা সব সোনা গলিয়ে এক বাছুরের মূর্তি বানায়, তাতে এক আওয়াজ হয়, আর তাতেই বনি-ইসরাইলরা সেটাকে পূজা করা শুরু করে। তাদের বোঝানো হয় এটাতে অনৈসলামিক কিছু নাই, এটা একটা মধ্যপন্থা। পরে মুসা (আঃ) ফিরে এসে সেটা ভাঙেন, তাদেরকে "শুদ্ধ" করতে আল্লাহ তা'য়ালা তাদেরকে একটা গরু কুরবানী দিতে বলেন। সেটা মানতেও বনি-ইসরাইলিদের অনেক কষ্ট হয়। এটার সাথে আজকে আমেরিকার অনেক মুসলিম বাসাবাড়িতে ক্রিসমাস উপলক্ষে ক্রিসমাস ট্রি রাখা, আলোকসজ্জা করার কী সম্পর্ক এটা বুঝতে লেকচাররা শুনতে হবে। আমি নিচে লিংক দিয়ে দিচ্ছি।
** চ্যাট জিপিটি **
[আবারো ডিসক্লেইমার: এখন যে বিষয়ে লিখবো সেটা কোনো খুতবার আলোচনা না, কাজেই খুতবার সারমর্ম মনে করে আর পড়ার দরকার নাই, বাকিটা না পড়লেও চলবে।]
ঘটনা -১: শেখ ইয়াসির ক্বাদীর রাসূল (সাঃ)'র জীবনী বা সিরাহর উপর লেকচারে একটা বিষয় শুনে আমি অনেকদিন থেকেই ব্যাপারটা নিয়ে লিখবো চিন্তা করছিলাম। কয়েক জায়গায় এসেছে যে আমাদের রাসূল (সাঃ) কে আল্লাহ তা'য়ালা ভুল শুধরিয়ে দিয়েছেন, আয়াত নাজিল করে সঠিক সিদ্ধান্ত কী হওয়া উচিত সেটা বলেছেন। এইরকম ৪-৫ টা ঘটনা আমার মাথায় আছে, লিখবো ভেবে রেখেছি। এই ঘটনা গুলো অনেকটা রাসূল (সাঃ)'র মনুষত্ব, আর কুরআন যে তাঁর নিজের লেখা না - এই ব্যাপারটা স্পষ্ট করে।
ঘটনা-২: আমার লাইনে আমি প্রফেশনার গুরু মানি আমার মামাতো বোনের জামাই, মাহবুব দুলাভাইকে। তিনি আমাকে অনেক সময়ই অনেক উপদেশ দিয়েছেন। তো, এই কয়েকদিন আগে আমাকে তিনি AI বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে পড়তে, ঘাটাঘাটি করতে উৎসাহ দিচ্ছেন। আমি খুব একটা আমলে নেই নাই। দুলাভাই আমাকে AI 'র উপর লেকচারের লিংক পাঠান, তো এবারের রসায়ন আর পদার্থ বিদ্যায় নোবেলে কিভাবে AI 'র ব্যবহার হয়েছে সেগুলোর ব্লগ পড়তে বলেন। উনি কয়েকদিন আগে আবার 'মুস্তাফা সুলাইমানের' লেকচারের লিংক পাঠিয়েছেন। সত্যি বলতে আমি এই লোকের নামও জানতাম না। মুস্তাফা সুলাইমান AI 'র বিগশট, লন্ডনভিত্তিক AI স্টার্টআপ কোম্পানি DeepMind 'র প্রতিষ্ঠাতা যেটা কিনা ২০১৬ সালে চাইনিজ বোর্ড গেম "Go"'র ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন কে হারিয়ে দিয়ে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিল। পরে Google DeepMind কিনে নেয়। এই লোক বর্তমানে Microsoft AI 'র সিইও। হোক, দুলাভাইয়ের সাথে দেখা বা কথা হলেই জিজ্ঞেস করবেন ভেবে, ভাবলাম মুস্তাফা সুলাইমানের একটা অডিওবুক নামিয়ে শুনি। ২০২৩-এ প্রকাশিত তার 'The Coming Wave" - বই (এখনো শুনে শেষ করি নাই) আমার সত্যিই অবাক লেগেছে। আগুন, পরে ইলেক্ট্রিসিটি যেভাবে মানব সভ্যতাকে পাল্টিয়ে দিয়েছে, এই লোকের দাবি AI সেটাই করবে!
ঘটনা-৩: দুলাভাইকে বইয়ের ব্যাপারে বললাম। বললেন ভালো, তবে শুধু পড়ে/শুনে না, বরং নিজের কাজে AI ব্যবহার করার পরামর্শ দিলেন। দুলাভাইই বুদ্ধি দিলেন, খুতবার সারমর্ম লিখতে রিসার্চ করতে Chat GPT ব্যবহার করে দেখতে পারো। আমি গতরাতে চ্যাট জিপিটি কে খুব ক্যাসুয়ালি/সাধারণভাবে বললাম: কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা রাসূল (সাঃ) কে কয়েক জায়গায় শুধরিয়ে দিয়েছেন, সেই ব্যাপারে বলো। আমাকে অবাক করে দিয়ে রেফারেন্স সহ ঘটনা গুলো বলতে লাগলো, সাথে ট্রান্সক্রিপ্টও লিখে দিলো! আমি তো পুরাই হতভম্ব! নিচে স্ক্রিনশট দিচ্ছি। আমি পরে এই নিয়ে লিখবো ইনশাআল্লাহ!
সবশেষ: দুলাভাইকে সকালে জানালাম। উনি আবার সাবধান করলেন যে চ্যাট জিপিটি মাঝে মাঝে ভুল করে, আলতু-ফালতু তথ্য দেয়। আমি যেন সব বিশ্বাস না করে, যাচাই করে নেই। মাহবুব দুলাভাই অসুস্থ। খুবই অসুস্হ, কি হয়েছে সেটা আর নাই লিখলাম। সবাই দুলাভাইয়ের জন্য একটু দোয়া করবেন প্লিজ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন