ইমাম সাফওয়ান ঈদ'র 'খাতারা' বা সংক্ষিপ্ত আলোচনা: আল্লাহ'র নিয়ম, জান্নাত ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছা আর জান্নাতি মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি
ইমাম সাফওয়ান ঈদ'র 'খাতারা' বা সংক্ষিপ্ত আলোচনা: আল্লাহ'র নিয়ম, জান্নাত ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছা আর জান্নাতি
মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি
[ডিসক্লেইমার: এই শুক্রবার, কিংবা তার আগের শুক্রবার না, আজকে লিখছি ইমাম সাফওয়ান ঈদের করা 'খাতারা' বা সংক্ষিপ্ত আলোচনা। টপিকগুলো তিনি একদিনে করেন নাই, বিভিন্ন দিন করেছেন, আমি মনে করে রেখেছিলাম, আজকে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে লিখছি। উনি সবসময়ই সমসাময়িক কিংবা প্রাকটিক্যাল বিষয় নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু এই আলোচনা গুলার কোনো রেকর্ডিং নাই যে লিংক শেয়ার করবো। কাজেই পড়ার সময় একটু বেশি সতর্কতা নিয়ে পড়তে হবে, আমার বোঝার, শোনার কিংবা মনে রাখার ভুল হতে পারে।]
আলোচনা - ১: মানুষজনের সাথে ইন্টারঅ্যাকশন-এ আল্লাহ'র নিয়ম মেনে চলা
ইমাম একটা সহীহ হাদিস বললেন, বুখারীতে উল্লেখ আছে, রাসূল (সাঃ)'র স্ত্রী সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই'র উদ্ধৃতি দিয়ে বলা আছে: একরাতে রাসূল (সাঃ) তাঁর স্ত্রী সাফিয়্যার সাথে ছিলেন, দুইজন আনসার সাহাবী অন্ধকারে তাঁদের ঠিকমতো হয়তো দেখতে পারেন নাই। রাসূল (সাঃ) কে কোনো মহিলার সাথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সাহাবীরা একটু ইতস্ততঃ করে দ্রুত চলে যাচ্ছিলেন, তখন রাসূল (সাঃ) তাঁদের ডাক দিয়ে বলেন, আস্তে যাও, আর বলেন: সে (এই মহিলা) আমার স্ত্রী সাফিয়্যা। উত্তরে সাহাবীরা বললেন: 'সুবহানাল্লাহ, ও রাসূলুল্লাহ!' - যেন বলতে চাইলেন 'আমরা আসলে অন্য কিছু ভাবি নাই ' - তখন প্রতি উত্তরে রাসূল (সাঃ) তাঁর সেই বিখ্যাত হাদিস বলেন যেটা অনেকটা এইরকম: "শয়তান মানুষের শরীরে রক্তের মত বয়ে বেড়ায়, আমি আশংকা করছিলাম সে তোমাদের মনে বাজে চিন্তা ঢুকিয়ে দিবে।"
ইমাম বললেন, আমরা যখন অন্যদের সাথে কথা বলবো, আমাদের সবসময় আল্লাহর নিয়ম মেনে চলতে হবে। উদাহরণ দিয়ে বললেন, তাঁর সাথে অনেকেই কাউন্সেলিং'র জন্য আসেন, মহিলারা আসলে অবশ্যই তাদের স্বামী বা মাহরাম নিয়ে আসবেন, অনেক সময় সেটা সম্ভব না হলে তাঁকেও খেয়াল রাখতে হবে যেন তিনি দূরত্ব, শালীনতা বজায় রেখে, আল্লাহকে স্মরণ করে কথা বলছেন। এরপর বললেন, তিনি দেখেছেন অনেক কালচারেরই কাজিনরা পর্দা মেনে চলেন না, "আমরা ভাই-বোন" - ভেবে চলেন। ইমাম সাবধান করলেন, আমরা 'কোনো ক্ষতি নাই' বা 'ফলাফল খারাপ হবে না' - সেটা ভেবে চলবো না, বরং সব ক্ষেত্রেই আল্লাহ'র নিয়ম মেনে চলবো, তাহলেই কোনো বাজে পরিস্থিতির শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না।
[সাইডনোট: আমার মনে পড়লো, UTA -তে টিচিং এসিস্টেন্ট/TA থাকা অবস্থায় আমাদের প্রতি বছর একটা কোর্স করতে হতো, কিভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে ইন্টারঅ্যাকশন করতে হবে, তাদেরকে কী বলা যাবে, আর কী বললে সেটা অফেন্সিভ বিবেচিত হবে, 'অফিস আওয়ার' - এ কেউ রুমে আসলে দরজা খুলে রাখতে হবে, ইত্যাদি শেখানো হতো।]
আলোচনা - ২: জান্নাত থেকে বের হতে চাওয়া!!
ইমাম সূরা কাহাফ [সূরা নম্বর ১৮, আয়াত ১০৮]'র আয়াত বললেন, যেখানে আল্লাহ তা'য়ালা বেহেশত বা জান্নাতীদের অবস্থা বলছেন, যার অর্থ অনেকটা এইরকম: "সেখানে তারা চিরস্থায়ী থাকবে, আর সেখান থেকে বের হয়ে অন্য কোথাও যেতে চাইবে না"!
ইমাম বললেন, আমরা হয়তো ভাবছি জান্নাত থেকে আবার কেউ কেন বের হতে চাইবে!? কিন্তু ইমাম বললেন, আগেও ছিল, এখনো একটা কথা প্রচলিত আছে, বিশেষ করে যারা ধর্ম নিয়ে ঠাট্টা করে, তারা বলে, জান্নাতে যদি সবসময় সুখই থাকে, কোনো দুঃখ-দুর্দশা না থাকে, তাহলে তো সেটা বোরিং/একঘেয়ে হয়ে যাবে; তার থেকে তো পৃথিবীই ভালো যেখানে সুখ-দুঃখ সবই আছে! ইমাম আরো বললেন, তিনি নিজেই এই কথা অনেকজনের কাছে শুনেছেন, গানে, সিনেমায় নাকি প্রায়ই এইগুলো বলা হয়! আর আল্লাহ তা'য়ালা যেন সেকারণেই পরিষ্কার করে বলে দিচ্ছেন, যাঁরা জান্নাতে যাবে, তাঁরা সেখান থেকে বের হতে চাইবেন না। জান্নাত কখনোই একঘেয়ে হবে না।
আলোচনা - ৩: জান্নাতি
ইমাম বললেন, তাঁর কাছে নাকি একদিন এক ব্যক্তি এসে বলেছেন, তিনি এমন একজনকে চিনেন, যে কিনা অমুসলিম, কিন্তু তাঁর কথা, কাজ এতো ভালো যে তাঁর কথা ভেবে, মৃত্যুর পর সেই লোকের কী হবে, সেটা ভেবে তার মন খারাপ হয়ে যায়, এমন একজন ভালো মানুষ কী করে জান্নাতে যাবে না - ভাবলেই তিনি তা মেনে নিতে পারেন না।
ইমাম বললেন, এর উত্তরে তিনি ওই লোককে বলেছেন, দেখুন, আল্লাহ তা'য়ালার মেসেজ কেউ পেয়ে না মানলে সেটা অবশ্যই দোষের। তার জন্য, সেই অবাধ্যতার (কুফরীর) জন্য আল্লাহ তাকে শাস্তি দিতেই পারেন। রাসূল (সাঃ)'র আগে যেইসব জাতি ছিল, তাদের জন্য তাদের কাছে প্রেরিত নবী-রাসূলদের মেসেজ মেনে চলাটাই দায়িত্ব ছিল। আমাদের সময় আমাদের রাসূল (সাঃ)'র মেসেজ মেনে, ইসলাম মেনে চলতে হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কী সেই মেসেজ ঠিকমতো পেয়েছি? কেউ যদি দাবি করে, আমি পাই নাই, আমি জানতাম না, সেটার বিচার আল্লাহ আর ওই ব্যক্তির মধ্যে হবে। কিন্তু কেউ মেসেজ পেলো, অনেক ভালো কাজ করলো, কিন্তু আল্লাহকে মানলো না, সেটার পর মৃত্যুর পর সে জান্নাত দাবি করতে পারবে না।
ইমাম আরো ব্যাখ্যা করলেন, আমরা যে বেঁচে আছি, এই প্রতি মিনিট বেঁচে থাকাটাও আল্লাহ তা'য়ালার অশেষ রহমত। এই চোখ, কান, দৃষ্টি শক্তি, বুদ্ধিমত্তা, শ্বাস-প্রশ্বাস, জীবিকার উপকরণ - ইত্যাদি আমরা কিছু না করে এমনি এমনিই পেয়েছি। সেগুলোর কৃতজ্ঞতা করেই আমরা শেষ করতে পারবো না, যত ভালো কাজই করি না কেন। এরপর আমাদের ভালো কাজের জন্য জান্নাত দাবি করাটা অযৌক্তিক। ইমাম বললেন, তবে আশার কথা হচ্ছে, আল্লাহ কুরআনে এই বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে বলেছেন [সূরা আন-নাহল, সূরা নম্বর ১৬, আয়াত ১৮], যার অর্থ অনেকটা এইরকম: "যদি তোমরা আল্লাহ'র নিয়ামত গণনা করো, তবে গুনে শেষ করতে পারবে না; আল্লাহ অবশ্যই বড়ই ক্ষমাশীল, বড়ই দয়ালু"।
[একটা সহীহ হাদিস আছে, যেটা আমরা অনেকেই জানি, আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করছেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, যার ভাবার্থ অনেকটা এইরকম: "তোমাদের কেউই শুধু তার আমল/কাজ দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। সাহাবীরা শুনে জিজ্ঞেস করলেন, এমন কি আপনিও না? উত্তরে রাসূল (সাঃ) বললেন, এমন কি আমিও, যদি না আল্লাহ আমাকে তাঁর অনুগ্রহ আর রহমতে আচ্ছাদিত করেন।" ]
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন