পর্ব - ৪ । সিরাহ বছর: ৪ । প্রকাশ্য দাওয়া, চিন্তা করার আহ্বান
পর্ব - ৪ । সিরাহ বছর: ৪ । প্রকাশ্য দাওয়া, চিন্তা করার আহ্বান
--------------------------------------------------------------------
নবুয়্যতের চতুর্থ বছর। রাসূল (সাঃ) যে নতুন এক ধর্ম বা জীবনব্যবস্থা ইসলামের কথা বলছেন, সেটা এখন আর গোপন নাই। এতদিন মুসলিমরা লুকিয়ে লুকিয়ে সালাত আদায় করলেও এখন কুরাইশদের অনেকেই জেনে গেছে যে কোথায় মুসলিমরা জড়ো হয়। এমন এক জমায়েতে মক্কাবাসীরা মুসলিমদের উপর চড়াও হলে গন্ডগোল বাধে, সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) একজনকে আহত করে ফেলেন। আরো নানাভাবে মুসলিমদের, বিশেষ করে যাদের গোত্রীয় কোনো সুরক্ষা নাই, মুসলিম দাস - এদের উপর মক্কাবাসীরা বিভিন্নভাবে অত্যাচার করতে থাকে। আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনের আয়াত নাজিল করে মুসলিমদের সান্তনা দেন, আর তাদেরকে কিভাবে মোকাবেলা করতে হবে, সেটাও রাসূল (সাঃ) কে জানিয়ে দেন। যেমন সূরা মুজাম্মিল -এ [সূরা নম্বর ৭৩, আয়াত ১০ - ১১]:
** তাদের কথার উপর ধৈর্য ধারণ করো এবং তাদের থেকে সুন্দরভাবে পৃথক হয়ে যাও। যারা সত্যকে অস্বীকার করে এবং ভোগ-বিলাসে মগ্ন, তাদের আমার উপর ছেড়ে দাও, এবং তাদেরকে সামান্য সময়ের জন্য সুযোগ দাও।**
আরো যেমন, সূরা তারিক'এর আয়াত [সূরা নম্বর ৮৬, আয়াত ১৭]:
** তারা কৌশল/ষড়যন্ত্র করে, আর আমিও (প্রতিব্যবস্থা হিসেবে) কৌশল করি। অতএব, অবিশ্বাসীদের জন্য সুযোগ দাও, তাদেরকে সামান্য সময়ের জন্য ছেড়ে দাও।**
ইতোমধ্যে ইসলামের কারণে কুরাইশরা তাদের পূর্ব-পুরুষের ধর্ম আর এর সাথে মক্কার ক্বাবাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা ব্যবসার ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত হয়ে উঠতে থাকে। তারা রাসূল (সাঃ)'র চাচা, আবু-তালিবের কাছে গিয়ে অনুরোধ করে যেন তিনি তার ভাতিজাকে বোঝান, কিছু বলে থামান। আবু তালিব যখন রাসূল (সাঃ) কে গিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করেন, তখন রাসূল (সাঃ) তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তিটি করেন, যা হাদিসে সংকলিত আছে:
"হে চাচা, আল্লাহর কসম, যদি তারা আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চাঁদ রেখে দেয়, তবুও আমি এই কাজ (ইসলামের দাওয়াত) ত্যাগ করব না, যতক্ষণ না আল্লাহ তা’আলা এটিকে বিজয়ী করেন অথবা আমি এতে প্রাণ দেই।"
উত্তরে আবু-তালিবও তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন: "তোমার যা ইচ্ছা তা করো, আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে ছেড়ে দিবো না / কখনও কারো কাছে [তোমাকে] সমর্পণ করব না।"
এইখানে একটা সাইডনোট হিসাবে বলে রাখা ভালো: মক্কার কুরাইশরাও সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতে বিশ্বাস করতো, কিন্তু মূর্তি পূজা করতো, আল্লাহর সাথে অন্য দেব-দেবীকে শরিক করতো, আর তাদের পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদের প্রতি, যেমন মুসা (আঃ) , ঈসা (আঃ) সহ অন্য নবী-রাসূলদের সম্পর্কে, তাঁদের উপর নাজিল হওয়া আসমানী কিতাবের সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। এমনকি মৃত্যুর পর পুনর্জন্ম, শেষ বিচারের দিন ইত্যাদি সম্পর্কেও ধারণা ছিল না। আর তাই, মক্কায় অবতীর্ন সূরা গুলোর মধ্যে এইসব বিষয় বারবার আসতে দেখা যায়। মক্কা অবতীর্ন সূরা গুলার অন্য আরেকটা বৈশিষ্ট হচ্ছে, এই সূরা গুলো ছন্দময়, ছোট ছোট, আর চিন্তার খোরাক জোগানো বিষয়ের উপর জোর দেয়।
কুরাইশদের এই দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিয়ে যাপিত জীবনকে প্রশ্ন করে এই সময় নাজিল হয়, সূরা আল-মু'মিনুন-এর আয়াত [সূরা নম্বর ২৩, আয়াত ১১৫]:
** তোমরা কি ভেবেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে অযথা সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না?**
আরো নাজিল হয়, সূরা আদ-দুখান-এর আয়াত [সূরা নম্বর ৪৪, আয়াত ৩৮ - ৩৯]:
**আমি আসমানসমূহ, জমিন এবং এদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছু অযথা সৃষ্টি করিনি। আমি সেগুলো যথাযথ উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছি, কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না।**
এইসব আয়াত শুনেও অনেক মক্কার কুরাইশরা মনোযোগী হয় না। তাদের কাছে মৃত্যুর পর পুনরুত্থান, কাজের হিসাব - এইসব বিশ্বাস হয় না। তাদের মনের এসব কথাই আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনে উদ্ধৃতি দেন, যেমন সূরা আল-আনামের আয়াত [সূরা নম্বর ৬, আয়াত ২৯]:
** তারা বলে, ‘আমাদের এই দুনিয়ার জীবন ছাড়া আর কিছুই নেই এবং আমরা পুনরুত্থিত হব না।**
আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হওয়া, কাজের হিসাব দেয়ার অস্বীকারকারীদের ব্যাপারে আরো নাজিল করেন, সূরা ইউনুস-এর আয়াত [সূরা নম্বর ১০, আয়াত ৭ - ৮]:
** যারা আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভে বিশ্বাস/আশা রাখে না, এবং দুনিয়ার জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে আর তাতেই নিশ্চিন্ত হয় এবং যারা আমার নিদর্শনগুলো হতে একেবারে উদাসীন, তাদের আবাস হল জাহান্নাম তাদের কৃতকর্মের কারণে। **
অন্যদিকে এইসব কথায়, আর তাদের অত্যাচারে, হাসি-তামাশায় মুসলিমরা কষ্ট পেলে আল্লাহ তা'য়ালা তাদের সান্তনা দিয়ে, পুরস্কারের ঘোষণা দিয়ে আয়াত নাজিল করেন, যেমন সূরা ফুসসিলাতের আয়াত [সূরা নম্বর ৪১, আয়াত ৩০ - ৩২]:
আরো নাজিল হয় সূরা ফুরকানের আয়াত [সূরা নম্বর ২৫, আয়াত ১৫ - ১৬], যেখানে আল্লাহ তা'য়ালা তার রাসূল (সাঃ) কে তাঁর সঙ্গীদের উৎসাহ দিয়ে প্রশ্ন করতে বলছেন:
মক্কার কুরাইশরা এতসব আয়াতেও সন্তুষ্ট হয় না। আল্লাহর তরফ থেকে কুরআনের এক একটা আয়াতই যেখানে অলৌকিক - এমন সুরময়, ছন্দোময় আরবি সূরা, যা তারা আগে কোনোদিনও শোনেনি - এক একটা মুজেজা, তারপরও তারা অলৌকিক কিছু দেখতে চায়। তারা আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কে চ্যালেঞ্জ করে বলে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করে দেখাতে। আল্লাহর নির্দেশে রাসূল (সাঃ) আঙুলের ইশারায় চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়, আবার এক হয় - তাও তারা বিশ্বাস করে না। তারা রাসূল (সাঃ) জাদুকর আখ্যা দিয়ে অগ্রাহ্য করে। আর কীভাবে রাসূল (সাঃ) তাদেরকে বোঝাবেন? আল্লাহ তা'য়ালা তার সৃষ্ট অন্যসব দৈনন্দিন জিনিসের প্রতি দৃষ্টি আর্কষণ করে, তাঁর রাসূল (সাঃ) কে সান্তনা দিয়ে আয়াত নাজিল করেন, সূরা গাশিয়া [সূরা নম্বর ৮৮, আয়াত ১৭ - ২০]:
** তারা কি দৃষ্টি দেয়নি উটের দিকে, কিভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে? আর আকাশের দিকে, কিভাবে তা উঁচু করা হয়েছে? আর পাহাড়ের দিকে, কিভাবে সেগুলো স্থাপন করা হয়েছে? আর পৃথিবীর দিকে, কিভাবে তা বিস্তৃত করা হয়েছে? অতঃপর তুমি তাদেরকে উপদেশ দাও, তুমি একজন উপদেশদাতা মাত্র। তুমি তাদের কাজের নিয়ন্তা নও। **
** কতই না কল্যাণময় তিনি যিনি মহাকাশে নক্ষত্ররাজির সমাবেশ ঘটিয়েছেন আর তাতে স্থাপন করেছেন প্রদীপ [সূর্য] আর আলো বিকিরণকারী চন্দ্র।আর তিনিই রাত আর দিনকে করেছেন পরস্পরের অনুগামী তাদের জন্য যারা উপদেশ গ্রহণ করতে চায়, অথবা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চায়।পরম করুনাময়ের বান্দা তারাই যারা যমীনে নম্রভাবে চলাফেরা করে আর অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে সম্বোধন করলে তারা বলে- ‘শান্তি’, (আমরা বিতর্কে লিপ্ত হতে চাই না)। **
মক্কায় অবতীর্ণ এইসব অপেক্ষাকৃত ছোট, ছন্দময় আয়াতের সমষ্টি সূরা গুলো এইভাবে আল্লাহর সৃষ্টির অলৌকিকতা, বিশালত্ব আর বিস্ময়ের প্রতি মানুষের দৃষ্টি আর চিন্তার আকর্ষণ করে তাদেরকে এক আল্লাহ'র উপর ঈমান আনতে আহ্বান করে। ইব্রাহিম (আঃ) -কে আল্লাহ তা'য়ালা যেই অনুগ্রহ করে ইসলামী আকিদার (Creed) সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, সেটাতে ফিরে আসতে আহ্বান করে। আর ইসলামী আকিদার নির্যাস অন্যতম দুই সূরা, সূরা ফাতিহা আর সূরা ইখলাস এই মক্কায় অবতীর্ণ হয়। যেহেতু আমরা মুসলিমরা প্রায় সবাই এই দুই সূরা মুখস্থ জানি, তাই শব্দের অর্থে সূরার আয়াতের অর্থ নিচে দিলাম। অর্থ জেনে সূরা পড়লে নামাজে/সালাতে যেমন মন লাগে, তেমনি ছন্দের সাথে মক্কায় অবতীর্ন ছোট সূরা বলতে কী বোঝায়, সেটাও উপলব্ধি করা যাবে:
সূরা ফাতিহা [সূরা নম্বর ১, আয়াত ১ - ৭]
** ১।
আল হ্বামদু – সকল প্রশংসা
লিল্লাহি – আল্লাহ’র জন্য
রাব্বিল – যিনি রব
আলামিন – বিশ্ব জগত।
(যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তাআলার যিনি সকল সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা)
২।
আর্-রাহ্মান – পরম দয়ালু
নির্-রাহিম – নিতান্ত মেহেরবান
(যিনি নিতান্ত মেহেরবান ও পরম দয়ালু)
৩।
মালিকি – মালিক
ইয়াওমিদ্দিন – বিচারদিনের
(যিনি বিচার দিনের মালিক)
৪।
ইয়্যাকা – শুধু তোমারই
নাআ্বুদু – আমরা ইবাদত করি
ওয়া-ইয়্যাকা – এবং শুধু তোমারই
নাসতাঈন – সাহায্য চাই।
(আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং শুধুমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি)
৫।
ইহ্দিনা – দেখাও(হিদায়া/গাইড কর)
সিরাত্ব – পথ
ল্-মুস্তাকিম – সরল
(আমাদেরকে সরল পথ দেখাও)
৬।
সিরাত্ব – পথ
-ল্লাজি্না – সে সমস্ত (লোকের)
আনআমতা – নেয়ামত
আ'লাই – উপর
হিম – তাদের
(সে সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ)
৭।
গ্বাইরি – নয় (তাদের পথ)
ল্-মাগদুবি – গজব
আ'লাই – উপর
হিম – তাদের
ওয়া-লা – এবং না
দ্দোয়াল্লিন – যারা পথভ্রষ্ট।
(তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে) **
**
১।
ক্বুল – বলুন (হে মুহাম্মদ (সাঃ))
হুয়া – তিনি
আল্লাহু – আল্লাহ
আহাদ (হ-গলার ভেতর থেকে উচ্চারণ হবে) – এক
(বলুন, তিনি আল্লাহ, এক)
২।
আল্লাহু – আল্লাহ
স্সামাদ – অমুখাপেক্ষী (যাঁর নিজের সাহায্যের প্রয়োজন নাই, কিন্তু সবাই তাঁর সাহায্য প্রার্থী)
(আল্লাহ অমুখাপেক্ষী)
৩।
লাম – না
ইয়ালিদ – জন্ম দেন (সন্তান হিসাবে) আওলাদ)
ওয়া – এবং
লাম – না
ইউলাদ – জন্মেছেন।
(তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি)
৪।
ওয়া – এবং
লাম – না
ইয়াকু – হয় (is)
ল্লাহু – তাঁর জন্য
কুফুওয়ান – সমতুল্য
আহাদ (হ-গলার ভেতর থেকে উচ্চারণ হবে) – এক(কেউ অর্থে)
(এবং তার সমতুল্য কেউ নেই) **
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন