পর্ব - ৩ । সিরাহ বছর: ৩ । ব্যক্তিগত পারিবারিক দাওয়া
পর্ব - ৩ । সিরাহ বছর: ৩ । ব্যক্তিগত পারিবারিক দাওয়া
[ডিসক্লেইমার: আমরা জানি, মুসলিমদের জন্য রাসূল (সাঃ)'র নাম উচ্চারণে কিংবা লিখলে 'সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম' অর্থাৎ তাঁর উপর [আল্লাহ তা'য়ালার] শান্তি ও আশীর্বাদ বর্ষিত হোক - বলে কিংবা সংক্ষেপে (সাঃ) লিখে দুরুদ পাঠ করতে হয়। একইভাবে তাঁর সাহাবী(দের) নাম উল্লেখে 'রাদিয়াল্লাহু আনহু(ম) [স্ত্রী বাচকে আনহা]' অর্থাৎ, '[আল্লাহ তা'য়ালা] তাঁদের উপর 'রাজি' বা সন্তুষ্ট হন' - বলে কিংবা (রাঃ) লিখে দোয়া করতে হয়। কিন্তু আমার এই লেখায় অনেক সময় অনেকের নাম লিখবো, যারা ঘটনাক্রম অনুযায়ী তখনও মুসলিম হোন নাই, পরে মুসলিম হয়ে রাসূল (সাঃ)'র সাহাবী হবেন। আমি তাঁদের নাম লেখার সময় হয়তো (রাঃ) লিখবো না। কিন্তু আপনারা তাঁদের সম্পর্কে আগে থেকেই জেনে থাকলে নিজ দায়িত্বে দোয়া পড়বেন। আর আমি চেষ্টা করি/করবো রাসূল (সাঃ)'র নামের পর দুরুদ পড়া মনে করিয়ে দিতে অবশ্যই (সাঃ) লিখতে। যদি কোথাও লিখতে ভুলে যাই, তাহলে নিজে থেকে পড়ে নিবেন। ধন্যবাদ!]
নবুয়তের তৃতীয় বছরে আল্লাহ তা'য়ালা রাসূল (সাঃ) কে আয়াত নাজিল করে তাঁর আত্মীয়-স্বজন, বর্ধিত পরিবারের লোকজনকে ইসলামের দাওয়াত দিতে বলেন [সূরা আশ-সুয়ারা, সূরা নম্বর ২৬, আয়াত ২১৪ - ২১৬]:
** আর তুমি সতর্ক করো তোমার নিকট আত্মীয়স্বজনদের। যে সকল মু'মিনরা তোমার অনুসরণ করে, তাদের প্রতি তোমার [অনুকম্পকার] বাহু প্রসারিত করো [ডানা নামিয়ে দাও]। আর তারা যদি তোমার অবাধ্যতা করে, তবে বলে দাও: 'তোমরা যা করো তা হতে আমি দায়মুক্ত' **
রাসূল (সাঃ) তাঁর নিকট আত্মীয় প্রায় ৪৫ জনকে বাসায় খাবার দাওয়াত দিলেন। কিন্তু খাওয়া-দাওয়া শেষে কিছু বলার আগেই তাঁর চাচা আবু-লাহাব মেহমানদের জমায়েত ভেঙে দিলেন। রাসূল (সাঃ) কিছু বলার সুযোগ পেলেন না। পরেরদিন তিনি আবারো সবাইকে দাওয়াত দিলেন। আর এবার তিনি দাঁড়িয়ে আল্লাহর একত্ববাদ ঘোষণা করলেন, আর তিনি যে আল্লাহর রাসূল সেটা বলে সবাইকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করলেন। আরো বললেন, ঠিক ঘুমানোর মতোই তোমাদের মৃত্যু হবে, আর ঘুম থেকে জেগে ওঠার মতোই আবার তোমাদের পুনরুজ্জীবিত করা হবে, আর তোমাদের কাজের হিসাব নেয়া হবে, আর তারপর হয় জাহান্নাম/নরক অথবা জান্নাত/স্বর্গ চিরদিনের জন্য নির্ধারিত হবে। কে কে তাঁর সাথে যোগ দিবে সেটা জিজ্ঞেস করলেন। সবাই চুপ করে থাকলে আলী (রাঃ) বলে উঠলেন তিনি রাসূল (সাঃ)'র সাথে আছেন। আলী (রাঃ)'র বয়স তখন মাত্র ১৩ বছর। আলী (রাঃ)'র এই কথায় কেউ কেউ হেসেও উঠে। আবু-লাহাব শুধু প্রত্যাখ্যান না, সে বলেই বসে যে এটা কুরাইশদের জন্য ক্ষতির কারণ হবে। সবাই উঠে চলে যাওয়া শুরু করলো। আলী (রাঃ)'র বাবা, রাসূল (সাঃ) আরেক চাচা, আবু তালিব একটু সাবধানী হয়ে পরোক্ষ সমর্থন দিলেন আর বললেন: "তুমি যা আদিষ্ট হয়েছো, তা করো, আমার সমর্থন আর সুরক্ষা তুমি পাবে, তবে আমি আব্দুল মুত্তালিবের [আমাদের পূর্বপুরুষের] ধর্ম ত্যাগ করতে পারবো না"
রাসূল (সাঃ)'র ছোট চাচা আব্বাস'ও চুপ করে ছিলেন, কিন্তু তাঁর স্ত্রী, রাসূল (সাঃ)'র চাচী উম্মুল ফাদেল এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করলেন। আর এর মাধম্যে তিনি খাদিজা (রাঃ)'র পর দ্বিতীয় নারী হিসাবে ইসলাম গ্রহণ করলেন। শুধু তাই না, উম্মুল ফাদেল তাঁর অন্য তিন বোনকে সাথে নিয়ে আসলেন, এঁরা হচ্ছেন: মায়মুনা, আসমা আর সালমা - রাদিয়াল্লাহু আনহুমা। অন্যদিকে রাসূল (সাঃ)'র ছয় ফুফুর মধ্যে শুধু সাফিয়্যা (রাঃ) ইসলাম কবুল করলেন। সাথে তাঁর ছেলে জুবায়ের ইবনে আল-আওয়ামও ইসলাম কবুল করলেন। এই জুবায়ের (রাঃ) পরবর্তীতে রাসূল (সাঃ)'র বিশ্বস্ত সাহাবী হয়ে আজীবন সমর্থন করবেন, আবু বকর (রাঃ)'র মেয়ে আসমাকে বিয়ে করবেন আর মক্কা বিজয়ে চার সৈন্যদলের নেতৃত্ব দিবেন। রাসূল (সাঃ)'র প্রতিশ্রুত ১০ জান্নাতি সাহাবীর মধ্যে জুবায়ের (রাঃ)'ও থাকবেন। আরকেজন ইসলাম কবুল করেন, তিনি হচ্ছেন উম্মে আয়মান।
আবু তালিবের সমর্থন আর সুরক্ষা পেয়ে পরে রাসূল (সাঃ) সাফা পাহাড়ে উঠে কুরাইশদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। [তখনকার দিনে গণ ঘোষণা দেয়ার এটাই রীতি ছিল] আর বললেন যা অনেকটা এইরকম: "যদি আমি বলি যে সাফা পাহাড়ের উল্টোদিকে একদল ঘোড়া সওয়ারী তোমাদের আক্রমণ করার জন্য তৈরী হচ্ছে, তোমরা কী আমাকে বিশ্বাস করবে?" - উত্তরে নিচে জমায়েত হওয়া কুরাইশরা তাঁর (সাঃ) বিশ্বস্ততার স্বীকৃতিতে হ্যাঁ-বাচক ইঙ্গিত দিলে, রাসূল (সাঃ) বলে উঠেন: "আমি তোমাদের এক কঠিন শাস্তি/যন্ত্রনা/আযাবের ব্যাপারে সাবধান করছি।"
জমায়েত হওয়া অন্যদের মধ্যে আবু-লাহাবও ছিল। আবু-লাহাব উত্তরে খেকিয়ে উঠে রাসূল (সাঃ) কে অভিশাপ দিয়ে বাজে মন্তব্য করে। সম্পর্কে রাসূল (সাঃ)'র চাচা-চাচী, আবু-লাহাব আর তার স্ত্রী, উম্মে জামিল - এই দম্পতি রাসূলকে (সাঃ) নানাভাবে হেনস্তা আর কষ্ট দিতে থাকে। এইখানে বলে রাখা দরকার: আবু-লাহাবের আসল নাম কিন্তু আবু-লাহাব নয়। এটা তার ডাক নাম। তার আসল নাম ছিল আব্দ-আল-উজ্জা। আবু লাহাব আক্ষরিক অর্থে মানে হচ্ছে আগুনের শিখার বাবা। সম্ভবত তার মাথা গরম, দাম্ভিক স্বভাব আর লাল গায়ের রংয়ের কারণে তাকে এই নামে ডাকা হতো। কী পরিহাসের ব্যাপার, আল্লাহ তা'য়ালা আবু লাহাবের পরিণতি 'লাহাবে' বা আগুনের লেলিহান শিখায় সেটা সরাসরি উল্লেখ করে সূরা নাজিল করেন: [সূরা লাহাব/আগুনের শিখা বা সূরা মাসাদ/পাকানো দড়ি, সূরা নম্বর ১১১, আয়াত ১ - ৫]:
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন