এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫): তাক্বওয়া আর রোজা/সিয়াম
এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫): তাক্বওয়া আর রোজা/সিয়াম
ইমাম ইসমাইল বোয়ার্স । ইসলামিক সোসাইটি অফ সেন্ট্রাল জার্সি, নিউ ব্রান্সউইক টাউনশিপ
ইমাম একটা গল্প দিয়ে খুতবা শুরু করলেন। বললেন এটা একটা সত্যি গল্প। এক তরুণ একবার এক আলেমের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো যে সে যা উপার্জন করে তা খুবই সামান্য, এই উপার্জনে কোনো বাড়ি করা তার পক্ষে কখনোই সম্ভব না, বিয়ে-শাদী করাও সম্ভব না, তার করণীয় কি? উত্তরে ওই আলেম নাকি শুধু বললেন "তাক্বওয়া" বাড়িয়ে জীবনযাপন করো। এই উত্তরে কিছুটা হতাশ হয়ে ওই তরুণ নাকি ভাবলেন বিজ্ঞ আলেম/শেখ যখন বলেছেন, তিনি নিশ্চয়ই জেনে বলেছেন, ভাবলেন চেষ্টা করেই দেখি। এরপর ওই তরুণ তাঁর দৈনন্দিন কাজে, কাজের জায়গায় 'তাক্বওয়া' বাড়িয়ে কাজ করা শুরু করলো। আর তাক্বওয়া মানে যেহেতু God Conscience বা আল্লাহর অস্তিত্ব/উপস্থিতি চিন্তা করে চলা, "আমার সব কাজ আল্লাহ দেখছেন" - এমন ভেবে চলা - ওই তরুণ, যে কিনা চাকরি সূত্রে একজন রিয়েল-এস্টেট এজেন্ট ছিল, তার সব কাজে, ব্যবসার লেনদেনে 'আল্লাহ দেখছেন' - এই চিন্তা করে কাজ করা শুরু করলো। চাকরিতে তার এজেন্সির মালিক কিছুদিন পর তার এই পরিবর্তন লক্ষ্য করলেন। আরো খেয়াল করলেন, কাস্টমাররা শুধু ওই তরুনের কারণেই তাদের এজেন্সির শরণাপণ্য হচ্ছেন, ব্যবসা ভালো হচ্ছে। একদিন সেই মালিক ওই তরুণকে বললেন, তিনি নিজেই একটা বাড়ি কিনবেন, সে যেন তার জন্য একটা বাড়ি খুঁজে দেয়। ওই তরুণ আর মালিক মিলে কয়েকটা বাড়ি দেখে শেষমেষ কয়েকমাস পরে ওই তরুণের পরামর্শেই একটা বাড়ি পছন্দ করে কিনলেন। সপরিপারে বাড়িতে উঠে কিছুদিন পর মালিক ওই তরুণকে তার পরিবার সহ দাওয়াত দিলেন। মালিকের ওই দাওয়াত দেয়ার উদ্দেশ্য ছিল নাকি ধন্যবাদ দেয়া ছাড়াও তার মেয়ের সাথে ওই তরুনের পরিচয় করিয়ে দেয়া। দুই পরিবারই ধর্মপরায়ণ, মালিক যখন দেখলেন তার মেয়ের ওই ছেলেকে পছন্দ হয়েছে, তিনি সরাসরি ওই তরুণকে তার মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিলেন। তরুণ রাজি হলে দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ে হয়, আর তাদের বিয়েতে মেয়ে আর মেয়ের জামাইকে ওই মালিক সেই বাড়িটিই উপহার হিসাবে লিখে দেন। সেই তরুণ পরে ওই আলেমকে ফোন করে ব্যাপারটা জানান। ইমাম আবারো বললেন, এটা একটা সত্যি ঘটনা।
এরপর ইমাম কুরআনের আয়াতের রেফারেন্স দিলেন, সূরা আল-তালাক'র আয়াত [সূরা নম্বর ৬৫, আয়াত ২ -এর শেষ অংশ আর ৩ আর প্রথম অংশ]: "আর যে কেউ আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে আল্লাহ তার জন্য (উত্তরণের) পথ করে দেবেন। আর তাকে রিযক দিবেন (এমন উৎস) থেকে যা সে ধারণাও করতে পারে না। যে কেউ আল্লাহর উপর ভরসা করে, তবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।"
ইমাম এরপর বললেন, সামনে রোজা মাস আসছে। প্রশ্ন করলেন, রোজা মাসে আমরা না-খেয়ে কেন থাকি? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি অনেককেই বলতে শুনেছেন, যেন আমরা গরিবের কষ্ট বুঝতে পারি, না-খেয়ে থাকার কষ্ট উপলব্ধি করতে পারি। ইমাম বললেন এই উত্তরটা ঠিক না। এই উত্তররা হয়তো রোজা রাখার একটা Wisdom বা উপকারিতা হতে পারে, কিন্তু আসল উত্তর আল্লাহ তা'য়ালা নিজেই কুরআনে দিয়ে দিয়েছেন, সূরা - বাকারার আয়াত [সূরা নম্বর ২, আয়াত ১৮৩]: "হে ঈমানদারগণ! তোমাদের প্রতি রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন তোমাদের আগের লোকেদের প্রতি [ইহুদি আর খ্রিস্টানদের প্রতি] ফরয করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।" ইমাম বললেন, কাজেই রোজা রাখার উদ্দেশ্যই হচ্ছে আমাদের 'তাক্বওয়া' অর্জন করা, বৃদ্ধি করা।
এরপর ইমাম বললেন, এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের এই না-খেয়ে থাকার সাথে তাক্বওয়ার সম্পর্ক কি? উত্তরে বললেন, রোজা মাসে আমরা আসলেই না খেয়ে আছি কিনা, এটা শুধু আমরা নিজেরা আর আল্লাহ ছাড়া কারো পক্ষে সত্যিকার অর্থে জানা সম্ভব না। আর এই যে 'কেউ দেখছে না তো কী হয়েছে, আল্লাহ দেখছেন' - এই চিন্তা থেকেই আমরা নিজেদের কোনো খাবার খাওয়া, কিংবা পানীয় পান করা থেকে বিরত থাকি - এইটাই আমাদের 'নাফসকে' বা সত্তাকে সংযত করে 'তাক্বওয়া' বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। ইমাম আরো বললেন, আমাদের সত্তা বা 'নাফস' সবসময়ই Pleasure বা সুখ খোঁজে। হালাল উপায়ে হোক, আর হারাম উপায়ে হোক - সব সময়ই সুখ পেতে চায়। আর রোজার সময় আমরা যা হালাল - যেমন খাবার, পানীয় ইত্যাদি - থেকে নিজেদের বিরত রেখে আসলে আমাদের এই নাফসকেই সংযত করতে শিখি। আমরা যখন 'হালাল' জিনিস ভোগ করা থেকে নিজেদের দমিয়ে রাখতে প্রশিক্ষিত হবো, তখন এমনিতেই 'হারাম' জিনিস আমাদেরকে পরবর্তীতে আর সেইভাবে আকর্ষণ করবে না।
এরপর ইমাম বললেন, আমাদের অনেকেই মোবাইল ফোনে আসক্ত। মোবাইল ফোনে সোশ্যাল মিডিয়া, মেসেজ না দেখে আমরা থাকতেই পারি না। ঘন্টার পর ঘন্টা স্ক্রলিং করে একটার পর একটা ভিডিও দেখে দেখে আমরা আমাদের Brain rot বা মগজ পচিয়ে ফেলছি। এই আসক্তি আসলে এক ধরণের ভালোবাসা। ইমাম বললেন, রাসূল (সাঃ)'র একটা সহীহ হাদিস আছে, যেটা নাকি অনেকটা এই রকম: "তোমার কোনো কিছুর প্রতি আসক্তি/ভালোবাসা তোমাকে অন্ধ আর বধির করে দেবে।" ইমাম ব্যাখ্যা করলেন, এই আসক্তি বা ভালোবাসা হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি বা ভালোবাসা। আর অন্ধ মানে হচ্ছে কোনো বিষয়ের উপর ফয়সালা বা সঠিক সিন্ধান্ত নিতে অক্ষম কিংবা নিজের ভুলের প্রতি অন্ধ হওয়া, আর বধির হওয়া বলতে উপদেশ গ্রহণে বধির হওয়া বোঝায়। কেবল তাক্বওয়া অর্জন করেই এইরকম আসক্তি থেকে বের হওয়া যাবে।
সবশেষে ইমাম বললেন, সবার তাক্বওয়ার স্তর এক না। এমাম বললেন, আলেমদের মতে, তাক্বওয়ার তিনটা স্তর আছে। আমাদের নিজেদেরকেই খুঁজে নিতে হবে আমরা কোন স্তরে পড়ি। সবচেয়ে নিচের স্তর হচ্ছে সেইটা যেখানে আল্লাহভীতি বা তাক্বওয়া নিয়ে চলার উদ্দেশ্য হচ্ছে পরকালে জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে, জান্নাতের সব পুরস্কার লাভ করা। ইমাম বললেন, এই স্তরে থাকলেও কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু এর উপরের স্তর হচ্ছে সেইটা যেইখানে মানুষ আল্লাহ'র ভীতি বা আল্লাহর স্মরণে শান্তি লাভ করে। উদাহরণ দিয়ে বললেন, রাতে উঠে কেউ কিয়ামুল-লাইল নামাজ বা তাহাজ্জুদ নামাজ তখনই পড়বে যখন সে তাতে শান্তি পাবে। যখন কেউ আর তাতে শান্তি পাবে না, বা সেটা পালনে বেশি কষ্ট হবে, তখনই সে সেটা ছেড়ে দিবে [যেহেতু সেটা বাধ্যতামূলক না]। আর সবচেয়ে উপরের স্তর হচ্ছে সেটা যেখানে কেউ মনে করে, আল্লাহ তা'য়ালা আমাকে এতকিছু দিয়েছেন, তাঁর প্রতি শুকরানা বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমার কর্তব্য, আল্লাহ আমার শুকরানার প্রকৃত দাবিদার, আমার যত কষ্টই হোক, অসুবিধা হোক আমি আল্লাহ তা'য়ালাকে ভালোবেসে আল্লাহর ইবাদত করবো, শুধু পরকালে জান্নাত পাওয়ার কিংবা শান্তি পাওয়ার জন্য না - সেটাই সর্বোচ্চ স্তর।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন