এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২১ মার্চ, ২০২৫): ইস্তিগফারের ফজিলত
এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২১ মার্চ, ২০২৫): ইস্তিগফারের ফজিলত
শেখ ইউসুফ বাকীর । মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন । ওয়েস্ট উইন্ডসর, নিউ জার্সি
ইমাম খুতবা শুরু করলেন বলে যে রোজার শেষ ১০ দিনে আমাদের রাসূল (সাঃ) যেই দোয়া সবচেয়ে বেশি বেশি করতেন, সেটা হচ্ছে (শব্দের অর্থে বাংলা লিখে দিচ্ছি): "আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন কারিমুন তুহিব্বুল আফওয়া ফা'ফু আন্না" :
আল্লাহ হুম্মা - ও আল্লাহ
ইন্নাকা - নিশ্চয়ই তুমি
আফুউন কারিমুন - সর্বোচ্চ ক্ষমা কারী
তুহিব্বুল - ভালোবাসো
আফওয়া - ক্ষমা করতে
ফা'ফু - তাই ক্ষমা করো
আন্না - আমাদেরকে
[কারিমুন যে বলে, এটা আমি জানতাম না]
এরপর ইমাম আরেকটা সহীহ হাদিস বললেন, যেখানে রাসূল (সাঃ) নাকি বলেছেন: যে ব্যক্তি ইস্তেগফার [আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমা চায়] আমল করে, আল্লাহ তাকে সবধরণের বাজে চিন্তা থেকে মুক্ত করেন, আর সবধরণের দুশ্চিন্তা থেকে উদ্ধার করে সবকিছু সহজ করে দেন। [এর পরের অংশ ইমাম আর বলেন নাই, আমি ইন্টারনেট ঘেঁটে পেলাম: আর তাকে এমন সব উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে চিন্তাও করে নাই]
ইমাম বললেন, আমাদের রাসূল (সাঃ)'র ভাষা খুব প্রাঞ্জল, আর মিতভাষী ছিল। উনি অল্প কথায় অনেক কিছু বলতে পারতেন। এরপর উপরের হাদিসটার মূল আরবী আর এতে ব্যবহার করা শব্দের অর্থ কত ব্যাপক হতে পারে সেটা ব্যাখ্যা করলেন। এরপর বললেন, ইস্তিগফার বা আল্লাহ'র কাছে মাফ চাওয়ার সাথে বাজে চিন্তা থেকে মুক্তি কিংবা মন থেকে সংশয়, দুশ্চিন্তা, আশংকা ইত্যাদি থেকে কিভাবে মুক্তি মিলে সেটা হয়তো কারো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে। বললেন, খুতবায় তিনি সেটা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবেন।
এরপর বললেন, আল্লাহ'র প্রেরিত সব নবী-রাসূল ইস্তিগফার বা আল্লাহ'র কাছে মাফ চাওয়ার উপর নিজেরা আমল করেছেন, তাঁদের উম্মতদেরকেও আমল করতে বলেছেন। উদাহরণ দিয়ে বললেন, আমাদের রাসূল (সাঃ) নিজে তো করতেনই আমাদেরকেও প্রতি ফরজ নামাজের পর ইস্তিগফার করতে উপদেশ দিয়ে গেছেন। এরপর উদাহরণ দিলেন, আদম (আঃ) আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। সূরা আল-আরাফ [সূরা নম্বর ৭, আয়াত ২৩], বাংলা উচ্চারণে অর্থ লিখে দিচ্ছি: "রাব্বানা জালামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফিরলানা ওয়া তারহামনা লানাকুনান্না মিনাল খাসিরীন।"
রাব্বানা - ও রব আমাদের
জালামনা - জুলুম করেছি আমরা
আনফুসানা - নিজেদের [নাফসের] প্রতি আমরা
ওয়া ইল্লাম - এবং যদি না
তাগফিরলানা - তুমি ক্ষমা করো আমাদের
ওয়া - এবং
তারহামনা - তুমি রহম করো আমাদের
লানা কুনান্না - অবশ্যই হবো আমরা
মিনা - হতে
আল-খাসিরীন - [সর্বোচ্চ] ক্ষতিগ্রস্থ
এরপর বললেন নূহ (আঃ), ইউসুফ (আঃ) 'র ইস্তিগফারের উদাহরণ কুরআনে আছে। ইমাম বললেন, সব নবীদের ইস্তিগফারের ঘটনা, রেফারেন্স আলোচনা করতে চাইলে এই এক খুতবায় হবে না। আর ইউনুস (আঃ)'র তিমি মাছের পেটে গভীর অন্ধকারে থাকা অবস্থায় করা ইস্তিগফারের দোয়া তো আমাদের সবারই জানা [সূরা আল-আম্বিয়া, সূরা নম্বর ২১, আয়াত ৮৭]: "লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজোয়ালিমিন":
লা - নাই
ইলাহা - কোনো ইলাহ/রব
ইল্লা - ব্যতীত
আন্তা - তুমি (আল্লাহ)
সুবহানাকা - সকল প্রশংসা তোমারই
ইন্নি - নিশ্চয়ই আমি
কুনতু - হয়েছি
মিনা - হতে
জোয়ালিমিনি - জালিমদের/সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত
এরপর ইমাম বললেন, যখন কেউ ইস্তিগফার করে, তখন সে মূলতঃ দুইটা জিনিস করছে: প্রথমতঃ সে আল্লাহর দাসত্ব স্বীকার করে নিচ্ছে, দ্বিতীয়তঃ সে তার নিজের ভুল স্বীকার করে নেয়। আর নিজের ভুল যে স্বীকার করে, সে-ই সেটা শুধরিয়ে উন্নতি করতে পারে। ইমাম বললেন, কেউ যখন অন্যের উপর জুলুম করে, সীমালঙ্ঘন করে, তখন যদিও সে মনে করে যে অন্যের ক্ষতি হয়েছে, প্রকারান্তরে সে আসলে নিজেরও ক্ষতি করছে। তখন মনে একটা চাপ তৈরী হয়। সে সেটা না বুঝলেও খেয়াল করলে দেখবে যে তার অন্তর শান্তিতে নাই, অস্থির হয়ে আছে। আর যখন কেউ ইস্তিগফার করবে আর পরে যার প্রতি অন্যায় করেছে, তার কাছেও মাফ চাবে, তখন নিজের অজান্তেই তার অন্তর স্থির হয়ে যায়, শান্তি আসে। আর যে ব্যক্তি ইস্তিগফার করে না/আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় না, সে আসলে তার 'ইগো'র কারণেই সেটা করে না। এমন ব্যক্তির সান্নিধ্যে কেউ থাকতে চায় না, কারণ সে নিজেকে সব সময় সঠিক মনে করে অন্যকে ছোট করে দেখে।
ইমাম বললেন, আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আমাদের সবচেয়ে ভালোভাবে জানেন। আমরা যে ভুল করবো সেটাও তিনি জানেন, আর এরপর মাফ চাইলে তিনি মাফ করবেন, সেটাও কুরআনে অনেক জায়গায় বলে দিয়েছেন। এরপর ইমাম মজা করে বললেন, তিনি যখনই আইকিয়া (IKEA) থেকে কোনো ফার্নিচার কিনেন, প্রায়ই ম্যানুয়াল না পড়েই ফার্নিচার লাগাতে লেগে পড়েন, তিনি ভাবেন তিনি পারবেন, কিন্তু কখনোই ঠিকমতো হয় না। তার পরিবার সবসময়ই তাঁকে এই নিয়ে মজা করেন। ইমাম বললেন, আইকিয়ার লোকজনই তাদের ফার্নিচার সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানে, কারণ তারাই সেগুলো বানায়, কাজেই তাদের ম্যানুয়াল বা নির্দেশিকা ফলো করলেই ঠিকমতো ফার্নিচার এসেম্বল করা যাবে। ঠিক একই ভাবে, আল্লাহ আমাদের তৈরী করেছেন, আমাদের দুর্বলতা, স্বভাব তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন, আমাদের নিজেদের থেকেও বেশি ভালো জানেন, কাজেই তাঁর দেয়া ম্যানুয়াল বা কুরআন মেনে চললেই আমরা সফলতা পাবো।
সবশেষে ইমাম বললেন, রাসূল (সাঃ) ঘুমানোর আগে একটা ইস্তিগফারের দোয়া সবাইকে শিখিয়ে দিয়ে গেছেন, তিনি নাকি বলেছেন, যেই ব্যক্তি ৩ বার এই দোয়া পড়ে ঘুমায়, তার গুনাহ আল্লাহ তা'য়ালা মাফ করে দেন। ইমাম বললেন, এইখানে ৩ বার সংখ্যা তা মুখ্য না বরং এই দোয়াতে জোর দেয়ার জন্যই রাসূল (সাঃ) তিনবার পড়তে বলেছেন। বললেন, এইটা আসলে মাইন্ডসেট ঠিক করে দেয়, বললেন ভাবুনতো কেউ যদি গত ১০ বছর ধরে প্রতি রাতে ৩ বার এই দোয়া পড়ে, তার কি আর কখনো এই দোয়া পড়তে ভুল হবে? বললেন, আজকের খুতবার আর কিছু না হোক, শুধু এই দোয়াটা যেন আমরা শিখে নেই, আর আমল করি। এরপর ধীরে ধীরে অর্থসহ কয়েকবার দোয়াটা বললেন। আমি বাংলা শব্দের অর্থ সহ লিখে দিচ্ছি: "আস্তাগফিরুল্লাহ আল্লাযী লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়ুল কাইয়ুম ওয়া আ'তুবু ইলাইহি"
আস্তাগফিরুল্লাহ - আমি ক্ষমা চাচ্ছি আল্লাহ'র কাছে
আল্লাযী - যিনি
লা ইলাহা ইল্লা - ছাড়া কোনো ইলাহ নাই
হুয়া - তিনি
আল- হাইয়ু - চিরঞ্জীব
আল-কাইয়ুম - প্রতিপালক
ওয়া - এবং
আ'তুবু - আমি তওবা/মাফ চাচ্ছি
ইলাইহি - তাঁর কাছে
[সবশেষ: ইমামের খুতবার ভিডিওটা পাচ্ছি না। মসজিদের ইউটুব চ্যানেলে খুঁজে পাই নাই। পেলে লিংক শেয়ার করে রাখতাম। রোজার শেষ ১০ দিনে সবাই সবার জন্য বেশি বেশি দোয়া করার অনুরোধ থাকলো, আর আমার কথায়, ব্যবহারে কেউ মনে আঘাত পেয়ে থাকলে আমি মাফ চাচ্ছি, সম্ভব হলে মাফ করে দিয়েন। ]
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন