এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১০ জুলাই, ২০২৫): শুক্রবারের ১০ আমল আর মুসা (আঃ)'র দোয়া

এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১০ জুলাই, ২০২৫):  শুক্রবারের ১০ আমল আর মুসা (আঃ)'র দোয়া   
শেখ ইউসুফ বাকির । মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন । ওয়েস্ট উইন্ডসর, নিউ জার্সি


[ডিসক্লেইমার: আজকের লেখায় আসলে খুতবার সারমর্ম লিখছি না। বরং তার আগেরদিনের বৃহস্পতিবার এশার নামাজের পর শেখ ইউসুফ বাকিরের করা সংক্ষিপ্ত আলোচনা বা 'খাতারা'-র সারমর্ম লিখবো ইনশাআল্লাহ। এই শেখ টেক্সাস থেকে মাঝে মাঝে নিউ জার্সিতে আসেন। উনি টেক্সাসের একটা মসজিদে ইয়ুথ ডিরেক্টর। উনি নিজেই অনেক কম বয়সী। মিশরীয় এই শেখ খুব চমৎকার আলোচনা করেন,  কথার উচ্চারণ, বাচনভঙ্গি মনোযোগ আকর্ষী। উনার শুক্রবারের খুতবা ছিল আল্লাহ তা'য়ালার কাছে মুসা (আঃ)'র করা দোয়ার উপর রিফ্লেকশন/আলোচনা। সেটার উপর লিখছি না , আমি খুতবার ভিডিও রেকর্ডিং'র লিংক পেলে শেয়ার করবো না হয়। আর আজকের লেখা ছোট হবে, ইদানিং লেখা বড় হয়ে যাচ্ছে, ফেইসবুক থেকে ফিডব্যাক পেয়েছি,  বেশি বড় লেখা হওয়ায় অনেকেই নাকি পড়ার ধৈর্য্য, মনোযোগ হারিয়ে ফেলছেন!]

ইমাম বললেন সপ্তাহের অন্যান্য দিনের থেকে শুক্রবারের মাহাত্ম বা ফজিলত বেশি। সহীহ হাদিস নাকি আছে এই শুক্রবারেই কিয়ামত হবে, আবার আদম (আঃ)'র তওবা এই শুক্রবারেই কবুল হয়েছিল [আরো কয়েকটা ঘটনা উল্লেখ করেছেন, আমার ঠিক মনে নাই]। ইমাম বললেন তিনি এই শুক্রবারের ১০ টা আমলের কথা বলবেন, আরো বললেন, যদিও এইগুলো শুক্রবারের আমল হিসাবে আছে, কিন্তু অনেক আলেমের মতে বৃহস্পতিবার থেকেই এইগুলো করা যেতে পারে। 

আমল ১: সূরা কাহাফ তেলাওয়াত করা: রাসূল (সাঃ) নাকি বলেছেন, যে ব্যক্তি শুক্রবার সূরা কাহাফ তেলাওয়াত করবে, সে শেষ জমানায় দাজ্জালের কবল থেকে মুক্ত থাকবে [সাইডনোট: প্রশ্ন আসতে পারে, আমরা তো আর শেষ জমানায় থাকবো না তাহলে? বলা হয়, শেষ জমানায় দজ্জালের আবির্ভাবে অনেক শক্ত ঈমান থাকা মুসলিমেরও আমল নষ্ট হয়ে বে-ঈমান হয়ে যাবে। কাজেই এটা উপমা হিসাবে বলা হচ্ছে যে, সূরা কাহাফ তেলাওয়াতে আমরা নিজেদের এখনই নিরাপদ রাখতে পারি।] ঈমাম বললেন, শুক্রবার দিন গাড়িতে/যানবাহনে করে মসজিদে আসার পথে, বাসায় সবাইকে নিয়ে আমরা শুক্রবার সূরা কাহাফ তেলাওয়াত করতে পারি। এমনকি বৃহস্পতিবার রাতেও সূরা কাহাফ তেলাওয়াত করতে পারি। 

আমল ২: গোসল করা: আমাদের রাসূল (সাঃ) নাকি কোনো জমায়েতে যাওয়ার আগে গোসল করে নিতেন। আর শুক্রবার জুমুআর দিনে তো অবশ্যই করতেন। বলা হয় এই গোসলের প্রতিটি পানির ফোটা যেন আমাদের গুনাহ ধুয়ে মাফ করে দিচ্ছে। 

আমল ৩: জুমুআর নামাজে আগে আগে আসা: শুক্রবার ইমাম মসজিদে মিম্বরে উঠার আগেই মসজিদে হাজির হওয়া। [ইমাম বলেন নাই, কিন্তু আমি আগে শুনেছি, বলা হয় শুক্রবার নাকি গরিবের হ্বজ। তাছাড়া যারাই শুক্রবার আজানের সাথে সাথে, ঈমাম খুতবার জন্য মিম্বরে উঠার আগেই হাজির হবে, তাদের জন্য একটা উমরা হ্বজের সমান সওয়াব হয়।] 

আমল ৪: আচার-ব্যবহার, মসজিদের আদাব রক্ষা করা: ইমাম বললেন এইটাই সবচেয়ে কঠিন আমল। শুক্রবার মসজিদে আসা, আর চলে যাওয়ার সময় যেন কোনোভাবেই আপনার-আমার আচরণে অন্য কেউ কষ্ট না পায়। তাহলে সব আমলই নষ্ট বা বৃথা হয়ে যাবে। এরপর অনেকটা সাইডনোট হিসাবেই বললেন, মসজিদে এসে প্রায়ই অনেককে অবৈধ গাড়ি পার্কিং করা, সিগন্যাল অমান্য করা, ভলান্টিয়ারদের কথা না শুনে ঝগড়া করতে দেখা যায় - এটা কোনোভাবেই করা যাবে না। [সম্পূর্ণ আমার মত: আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে আমি দেখেছি মুসল্লিরা মসজিদে জায়গা রেখেই রাস্তায় জ্যাম বাধিয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে যান। মাইকে জোরে জোরে খুতবা বাজানো, শোনানো হয়। অন্যের অসুবিধা করে জুমুআ আদায় করা কী হচ্ছে? এইগুলো কী আদাব রক্ষা করা? ]

আমল ৫: খুতবা চলার সময় সম্পূর্ণ ভাবে ঈমামের প্রতি মনোযোগ দেয়া: ইমাম বললেন, তিনি অনেককেই দেখেন খুতবা চলার সময় ফোন হাতে নিয়ে অমনোযোগী হয়ে আছেন। বললেন এতে তাঁর খুব কষ্ট হয়। তাঁর খুতবা শুনছেন না, এই জন্য কষ্ট না, বরং এইটা জেনে যে ওই ফোন হাতানো ব্যক্তির জুমুআ সওয়াব বাতিল হয়ে যাচ্ছে।  কারণ রাসূল (সাঃ)'র সময় মদিনায় মসজিদে নুড়ি-পাথর ছিল, আর সহীহ হাদিস আছে খুতবা চলার সময় কেউ যদি অমনোযোগী হয়ে সামান্য নুড়ি-পাথর দিয়েও খেলা করে -তাহলে তার জুমুআর সওয়াব বাতিল হয়ে যায়। ইমাম মজা করে বললেন, আমাদের সময় মসজিদের ভেতর আর নুড়ি-পাথর নাই, আমাদের ফোনই যেন আজকের দিনে নুড়ি-পাথর। [আমি আগে শুনেছি: বলা হয় ওই সময় আপনাকে কেউ সালাম দিলেও আপনি উত্তর দিবেন না,  হাতের ইশারায় হাই-হাল্লো বললেও আপনি তাকিয়ে, মাথা ঝাকিয়ে উত্তর দিবেন না, বরং ইমামের দিকে পূর্ণ মনোযোগ রাখবেন।]      

আমল ৬: সাদাকা দেয়া: শুক্রবার সামান্য হলেও সাদাকা দেয়ার অভ্যাস করতে হবে। সেইভাবে প্রস্তুতি নিয়ে আসতে হবে যাতে মসজিদ থেকে যাওয়ার সময় সাদাকা না দিয়ে কেউ ফিরে যাবে না। 

আমল ৭: মা-বাবার জন্য বিশেষভাবে দোয়া করতে হবে। আর সবচেয়ে ভালো দোয়া হচ্ছে, 'রাব্বির-হাম-হুমা-কামা, রাব্বা ইয়ানি সগীরা'। ইমাম বললেন, এই দোয়া যে শুধু মৃত মা-বাবার জন্য করতে হয় এমন নয়, জীবিত থাকুন বা মারা গিয়ে থাকুন, মা-বাবার জন্য এই দোয়া সব সময় করতে হবে। বিশেষভাবে শুক্রবার।

আমল ৮: অসুস্থ আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীর জন্য, রোগমুক্তির জন্য মনে করে দোয়া করতে হবে। 

আমল ৯: মৃত আত্মীয়-স্বজনদের জন্য দোয়া করতে হবে। 

আমল ১০: মুসলিম উম্মাহ'র জন্য, বিশেষ ভাবে যারা বিপদগ্রস্থ তাদের জন্য বেশি বেশি দোয়া করতে হবে। আর আমাদের জন্য এখন সেটা ফিলিস্তিনিদের জন্য দোয়া করা। 

ইমাম সবশেষে আবারো এই ১০ টা আমল রিভিউ করার সময় বললেন, তিনি এক নম্বরে সূরা কাহাফ তেলওয়াত/পড়ার সাথে আরেকটা জিনিস যোগ করতে চান, আর সেটা হচ্ছে বেশি বেশি করে রাসূল (সাঃ)-র উপর দুরুদ, সালাম পাঠ আর তাঁর পরিবার, সাহাবী আর তাবেঈ (ফলোয়ার)'র জন্য দোয়া করা।    

   

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ