এই শুক্রবারের খুতবার সারমর্ম (১৭ অক্টোবর, ২০২৫): তাওয়াক্কুল বা আল্লাহ'র উপর ভরসা
এই শুক্রবারের খুতবার সারমর্ম (১৭ অক্টোবর, ২০২৫): তাওয়াক্কুল বা আল্লাহ'র উপর ভরসা
শেখ কামালউদ্দিন আহমেদ । মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন । ওয়েস্ট উইন্ডসর, নিউ জার্সি
[আপডেট: Nayeem Md.Faruk নাঈমের কাছ থেকে পাওয়া মেসেজ, "আসসালামু আলাইকুম, ভাই। আজকের লেখায় কয়েক যায়গায় তাওয়াকুল্লাহ বা তাওয়াক্কা আ'লাল্লাহ বলসেন। একটু চেক করবেন? ফ্রেইজটা মনে হয় তাওয়াক্কুল আ'লাল্লাহ, বা সিম্পলি তাওয়াক্কুল।" -- ঠিক করে দিচ্ছি।]
[ভূমিকা/ডিসক্লেইমার: দুই সপ্তাহ আগের এই খুতবার সারমর্ম লিখছি খুব দায়সারা ভাবে। খুতবার টপিক'র গুরুত্বের তুলনায় এই লেখা খুব হালকা হবে। আমি মনে মনে ঠিক করেছিলাম এইরককম অবস্থায় কখনো সারমর্ম লিখবো না। কিন্তু খুতবাটা অন্য একজন ইমাম দিলেন, শেখ কামালউদ্দিন আহমেদ -- যাঁর খুতবা আগে কখনো শুনি নাই। সত্যি বলতে আমি সেদিন একটু অন্যমনষ্ক ছিলাম, দ্বিতীয় খুতবায় গিয়েছি, যেটার রেকর্ডিং সাধারণত মসজিদের ইউটুব চ্যানেল-এ আপলোড হয় না, কুরআনের আয়াতের রেফারেন্স'ও ভালোভাবে খেয়াল করি নাই, আর তাই জুমআর শেষে, বলবো কী বলবো না করে করে যখন শেষমেশ ইমামের কাছে গিয়ে বললাম যে আমি বাংলায় আমার পরিবার-আত্মীয় আর বন্ধুদের জন্য খুতবার সারমর্ম লিখি, আপনার নোটের একটা ছবি তোলা যাবে কিনা? উনি তাঁর পুরা খুতবার ৩ পৃষ্ঠার নোট আমাকে দিয়ে দিলেন। দিয়ে এও বললেন, এতে কুরআনের আয়াত আছে, আমি যেন ডিসকার্ড করার সময় ঠিকভাবে করি, যেখানে সেখানে ফেলে না দেই। পরে আমার মনে হয়েছে, আমি তো আসলে উনাকে অনেকটা কথা দিয়ে ফেলেছি, এখন তো লিখতেই হবে। আর তাই লেখার চেষ্টা করছি। আর এই শুক্রবারের [২৪ অক্টোবর, ২০২৫] খুতবাটা পুরাটাই রাসূল (সাঃ)'র একটা হাদিসের উপর হয়েছে। শেখ ইউসুফ বাকির বরাবরের মতোই চমৎকার ভাবে আলোচনা করেছেন। ইউটিউবে খুতবার লিংক আছে, আমি হাদিসটা লিখে লিংক শেয়ার করে দিচ্ছি। কেউ চাইলে দেখে নিতে পারেন।]
ইমাম খুতবা শুরু করলেন বলে যে তিনি গত দুই বছরে যতবারই কোনো আলোচনা বা খুতবা দিয়েছেন, চেষ্টা করেছেন যেন গাজায় হয়ে চলা ঘটনাগুলো থেকে কিছু শিক্ষণীয় বিষয় সবার সামনে তুলে ধরতে। আর আজকেও তাই তিনি চেষ্টা করবেন। বললেন, গাজায় শান্তি নেই, গাজাবাসি চরম অনিশ্চয়তার মাঝে আছে, কিন্তু এরপরও তাঁদের একটা জিনিস আছে যেটা তিনি লক্ষ্য করেছেন, সেটা হলো তাওয়াক্কুল-আ'লাল্লাহ বা আল্লাহর ওপর ভরসা। ইমাম জিজ্ঞেস করলেন, এই 'তাওয়াক্কুল-আ'লা-আল্লাহ' বা আল্লাহর উপর ভরসা করার মানে কী? তিনি কুরআনের আয়াত আর রাসূলের সুন্নাহ থেকে সেটা আলোচনার চেষ্ঠা করবেন।
ইমাম কুরআনের আয়াতের রেফারেন্স দিলেন, আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনে বলেছেন: [সূরা আত-তালাক, সূরা নম্বর ৬৫, আয়াত ৩] আর অর্থ অনেকটা এইরকম: "যে কেউ আল্লাহর উপর ভরসা করে, তবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ নিজের কাজ সম্পূর্ণ করবেনই। আল্লাহ প্রতিটি জিনিসের জন্য করেছেন একটা সুনির্দিষ্ট মাত্রা।" ইমাম মন্তব্য করলেন, আল্লাহ তা'য়ালা জানেন যে আমরা আল্লাহ'র উপর ভরসা করেও হয়তো সন্দেহ করবো, এই আয়াতে আল্লাহ তাই নিশ্চিত করে দিয়েছেন, "তবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট"।
এরপর ইমাম বললেন, কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা বিশ্বাসী আর আল্লাহ তা'য়ালার উপর "তাওয়াক্কুল" করে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন, [সূরা আল-আনফাল, সূরা নম্বর ৮, আয়াত ২]: "মু’মিন তো তারাই আল্লাহর কথা আলোচিত হলেই যাদের অন্তর কেঁপে উঠে, আর তাদের কাছে যখন তাঁর আয়াত পঠিত হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে আর তারা তাদের রবের/প্রতিপালকের উপর নির্ভর করে।" এরপর ইমাম একটা সাইড মন্তব্য করলেন: বললেন আমরা অনেকেই মসজিদে ঢুকে 'তাহিয়্যাতুল মসজিদ' [মসজিদের সম্ভাষণ] -এর দুই রাকাত নামাজ পড়ি না। কিন্তু উচিত ছিলো, মসজিদে ঢুকার সময়, আমরা আল্লাহ'র ঘরে ঢুকছি, সেটা মনে করে আমাদের অন্তর সম্মানে কেঁপে উঠবে, আমরা ঢুকেই সময় থাকলে, দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদের নফল নামাজ পড়বো।
এরপর ইমাম বললেন, আল্লাহ'র উপর নির্ভর করা মানে এই না যে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে, কোনো চেষ্টা না করে বসে থাকা। আল্লাহ প্রদত্ত 'তৌফিক' কাজে লাগিয়ে চেষ্টা করতে হবে, আর ফলাফলের জন্য আল্লাহ'র উপর ভরসা করতে হবে। এরপর ইমাম আমাদের আরেকটা ভুলের কথা খেয়াল করিয়ে দিলেন। বললেন, আমরা অনেকে সব শেষে এই 'তাওয়াক্কুল' করি: যেমন, কোনো সিন্ধান্ত নিতে হবে আমরা সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে, বাকি সব কিছু করে তারপর 'ইস্তেখারা' করি, তারপর সিদ্ধান্ত নেই। না, বরং শুরুতেই ভাবতে হবে, শুরুতেই আল্লাহকে ডেকে তাঁর উপর ভরসা বা তাওক্কুল করে এরপর সব কিছু গুছাতে হবে, 'ইস্তেখারা' করতে হবে যে আমার এই কাজে যদি আমার জন্য 'ভালো' থাকে তাহলে যেন কাজটা করা সহজ হয়, আর না থাকলে যেন সরে আসতে পারি। এই মনোভাব নিয়ে কোনো কাজ করলে, ফলাফল যাই-ই হোক না কেন, আমরা 'আলহামদুলিল্লাহ' বলে ফলাফল মেনে নিতে পারবো - সেটা আমরা যেটা চাচ্ছিলাম, সেটা হোক কিংবা না হোক। কারণ, আমরা নিশ্চিত জানবো যে যেটা হয়েছে সেটা আল্লাহ'র ইচ্ছায়, তাঁর সন্তুষ্টির কারণেই হয়েছে। আর এই রকম নির্ভর করা ব্যক্তির সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন, সূরা আলে-ইমরান [সূরা নম্বর ৩, আয়াত ১৫৯]-র অংশ: "আর আপনি যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তখন আল্লাহ'র উপর ভরসা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ভালোবাসেন তাদেরকে যারা তাঁর উপর ভরসা করে।"
ইমাম একটা সহীহ হাদিস বললেন, আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে রাসূল (সাঃ) নাকি বলেছেন: তোমাদের প্রত্যেকের দোয়া কবুল হবে, যতক্ষণ না তোমরা অধৈর্য্য হচ্ছ আর বলছো: আমি তো দোয়া করেছি কিন্তু উত্তর পাইনি। অর্থাৎ, নেক দোয়া করে ধৈর্য্য ধরে নিশ্চিতভাবে দোয়া কবুলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আল্লাহ'র উত্তর আসবেই।
সবশেষে ইমাম একটা মন্তব্য করলেন যেটা না লিখে পারছি না। ইমাম বললেন, আমাদের অনেকেই আফসোস করেন যে 'ইশ! আমি যদি রাসূল (সাঃ)'র সময় [মক্কা-মদিনায়] জন্মাতাম!' -- ইমাম বললেন, সাবধান! আমাদের ঈমানের যে লেভেল, কে জানে, হয়তো তাহলে তখন আমরা আবু-লাহাব সহ ইসলামের অন্য শত্রুদের সঙ্গী হতাম। আল্লাহ'র অশেষ রহমত যে তিনি আমাদের এই যুগে জন্ম দিয়েছেন। তাছাড়া, আমরা হয়তো সাহাবীদের কে দেখি নাই, তাই আফসোস করছি, কিন্তু আমরা এখন 'গাজাবাসী' কে দেখছি। তাঁদের জন্য কিছু করা, দোয়া করা, সাহায্য পাঠানোর চেষ্টা করাটাও আমাদের জন্য অত্যন্ত সম্মানের।
------
এই শুক্রবার খুতবায় আলোচনা করা রাসূল (সাঃ)'র হাদিস: আবু হুরাইরা (রাঃ)'র বর্ণনা করা, সহীহ মুসলিমের ২৬৯৯ নম্বর হাদিস, রাসূল (সাঃ) নাকি বলেছেন: "যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট ও বিপদ দূর করে দেয়, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিনের একটি কষ্ট ও বিপদ তাঁর থেকে দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবগ্রস্তের জন্য সহজ করে দেয়, আল্লাহ তাআলা তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে সহজ করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখে, আল্লাহ তা'আলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার সাহায্যে থাকেন যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে। যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের জন্য কোনো পথে চলে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। আর যে কোনো দল আল্লাহর ঘরসমূহের (অর্থাৎ মসজিদসমূহের) একটিতে একত্রিত হয়ে আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করে ও পরস্পরের মধ্যে তা অধ্যয়ন করে, তাদের উপর প্রশান্তি (সাকিনাহ) নাজিল হয়, রহমত তাদের আচ্ছাদন করে, ফেরেশতাগণ তাদের ঘিরে রাখে, এবং আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তাঁর সান্নিধ্যে (মালাইকাদের/ফেরেশতাদের মাঝে) স্মরণ করেন।"
খুতবার লিংক: https://www.youtube.com/live/RthNmbZEw0I?si=KomRrB0jf_F9fP3P
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন