পর্ব - ১৬ । সিরাহ বছর: ১০ । তাইফের যাত্রা
পর্ব - ১৬ । সিরাহ বছর: ১০ । তাইফের যাত্রা
-----------------------------------------------------
ভূমিকা: আগের সব পর্ব গুলো এক জায়গায় পেতে ভিসিট করতে পারেন নিচের লিংক: https://banglasirah.substack.com/publish/posts
আর আমার লেখার মূল সোর্স হচ্ছে মূলত দুইটা বই: ডা. মেরাজ মহিউদ্দিনের 'রেভেলেশন: স্টোরি অফ দ্যা প্রফেট (সাঃ)', আর ড. ইয়াসির ক্বাদীর 'দ্যা সীরাহ অফ দ্যা প্রফেট (সাঃ) '
হাশিম গোত্রের নেতা রাসূল (সাঃ)'র চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর পর আমাদের নবী এখন অভিভাবকশূন্য। মক্কার সমাজ ব্যবস্থায় কারো জিম্মাদারিতে না থাকা মানে প্রায় মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে ঘোরাফেরা করা। যে কেউ যখন তখন, কারণ ছাড়াই আঘাত করতে পারে, এমনকি কোনো প্রকার জবাবদিহিতা ছাড়াই, প্রাণে মেরে ফেলতে পারে - কেউ কিছু বলবে না। এর উপর রাসূল (সাঃ) তাঁর স্ত্রী খাদিজা (রাঃ) কে হারিয়েও মানসিক সমর্থন হারিয়ে ফেলেছেন। এমন অবস্থায় রাসূল (সাঃ) মক্কার অদূরে, প্রায় ৫৫-৬০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বের শহর তাইফে সমর্থন আদায় করতে তাঁর পালক পুত্র জায়েদ (রাঃ) কে নিয়ে নীরবে-নিভৃতে পায়ে হেঁটে রওনা হলেন। তাইফে যাওয়ার কারণ, তাইফ শহরের বাসিন্দাদের সাথে তাঁর (সাঃ) দূরসম্পর্কের আত্মীয়তা আছে। তাছাড়াও মক্কা-আর তাইফ বাসীরা একে অপরের অবস্থা, সমাজ ব্যবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে জানতো। তাইফে তিন ভাই শাসনকার্য পরিচালনা করতো। এদের কাছে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিলে, মক্কায় তাঁর অবস্থা ব্যাখ্যা করে সমর্থন চাইলে কোনো লাভ হলো না। এক ভাইতো নাকি বলেই বসলো: "আপনি যদি সত্যিই কোনো রাসূল হন, তাহলে আমার আপনার সাথে কথা বলা মানায় না, আর যদি মিথ্যাবাদী হন, তাহলেও আপনার সাথে আলাপ করে আমার কোনো লাভ নাই। অতএব, আমি আপনার সাথে কথা বলছি না!" রাসূল (সাঃ) তাইফের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের আহ্বান করে ব্যর্থ হয়ে এইবার তাইফের সাধারণ মানুষের কাছে দাওয়াত দিতে গেলেন। আরো প্রায় সপ্তাহ-দশদিন তাইফে থাকলেন। এই খবরে তাইফের গোত্র প্রধানরা এইবার ছেলেপেলের দল সহ সমাজের দাস-ভৃত্যের দলকে রাসূল (সাঃ)'র উপর লেলিয়ে দিলো, তাঁকে শহর থেকে বের করে দিতে বলল।
রাসূল (সাঃ) কে তাইফের এইসব লোকজন আর ছেলেপেলের দল পাথর ছুঁড়ে ছুঁড়ে তাড়া করলো। জায়েদ (রাঃ) নিজ শরীর দিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করেও রাসূল (সাঃ) কে পাথরের আঘাত থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হলেন। রাসূল (সাঃ) আর জায়েদ (রাঃ) দুইজনই রক্তাক্ত হলেন। শেষমেষ তাঁরা দুইজন তায়িফের সীমানার বাইরে গেলেই এই অত্যাচার থেকে রক্ষা হলো। তায়িফের বাইরে এক বাগানের কাছাকাছি এসে যেন রাসূল (সাঃ) আর নিতে পারলেন না, দুঃখে-কষ্টে, আঘাতে-হয়রানে বসে পড়লেন। আপনজনকে হারিয়ে, মক্কায় শত্রু বেষ্টিত হয়ে প্রাণনাশের আশংকায় তাইফে এসে সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হয়ে রাসূল (সাঃ) যেন ভেঙে পড়লেন। আল্লাহর কাছে হাত তুলে দোয়া করলেন। যেই দোয়া এখনো চরম বিপদে আমাদের দোয়া করার উপায় শেখায়, আল্লাহ তা'য়ালার উপর কিভাবে নির্ভর করতে হয়, তাঁর কাছে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে কিভাবে আত্মসমর্পণ করে সাহায্য চাইতে হয় -- সেটার এক উদাহরণ হয়ে থাকলো। দোয়াটার বাংলায় অনেকটা এই রকম:
"ও আল্লাহ, আমি শুধু তোমার কাছেই আমার দুর্বলতা, আমার অক্ষমতা আর মানুষের কাছে আমার অপমানের অভিযোগ করি। তুমি সব দয়ালুর চেয়ে বেশি দয়ালু, তুমি নিঃস্ব আর দুর্বলের প্রভু। ও আমার রব! এ তুমি কার হাতে আমাকে তুলে দিচ্ছ : অসহমর্মী দূরসম্পর্কের আত্মীয় যারা আমার দিকে ভ্রূকুটি নিয়ে তাকায়, নাকি শত্রুদের হাতে যারা আমার উপর ক্ষমতা রাখে? কিন্তু যদি তোমার ক্ষোভ আমার উপর না বর্তায়, তাহলে আমি আর কোনো কিছুর পরোয়া করি না। তোমার ক্ষমাই আমার জন্য যথেষ্ট, আমি তোমার মুখমন্ডলের নূরের উপর আশ্রয় চাই যা সব অন্ধকারকে দূর করে দেয়, যা দুনিয়া আর আখিরাতের সব কিছু ঠিক করে দেয়। আমি যেন তোমার ক্ষোভের কারণ না হই, তোমার ক্ষোভ যেন আমার উপর না পড়ে। তোমার প্রতিই সব মিনতি যতক্ষণ না তুমি সন্তুষ্ট হও। তোমার শক্তি-সম্মতি ছাড়া আর কোনো শক্তি-সামর্থ নাই।"
[সাইডনোট: আল্লাহর মুখমন্ডলের নূর আরবিতে একটা উপমা। এটাকে আক্ষরিক অর্থে নেয়া যাবে না। আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর সৃষ্টির কোনো কিছুর সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নন।]
রাসূল (সাঃ) আর জায়েদ (রাঃ)'র এই অবস্থা দূর থেকে এই বাগানের মালিকরা দেখছিলো। এরাও কুরাইশী। এরা ঠিকই রাসূল (সাঃ) কে চিনতে পারলো। দেখে হয়তোবা তাদের দয়া হলে তারা তাদের ভৃত্য আদ্দাসকে কিছু আঙ্গুর দিয়ে রাসূল (সাঃ)র কাছে পাঠালো। রাসূল (সাঃ) 'বিসমিল্লাহ' [আল্লাহ'র নামে শুরু করছি] বলে আঙ্গুর খেতে শুরু করলে আদ্দাস অবাক হয়ে গেলো। এই আদ্দাস আসলে মক্কা অঞ্চলের না। তিনি এখনকার উত্তর ইরাকের যা তখন নিনেভা অঞ্চল হিসাবে পরিচিত ছিল, সেই অঞ্চল থেকে আসা এক খ্রিষ্টান। আদ্দাস অবাক হয়ে বলেই বসলো: "আপনি কী বললেন? এই কথা তো এই অঞ্চলের কেউ বলে না?" তখন রাসূল (সাঃ) তার পরিচয়, কোথা থেকে আসছেন জিজ্ঞেস করে যখন জানলেন সে নিনেভা অঞ্চলের খ্রিস্টান, তখন রাসূল (সাঃ) নাকি বললেন: "তুমি নিষ্টাবান/ধার্মিক ইউনূস -ইবনে মাত্তার (আঃ) অঞ্চলের লোক। সে আমার ভাই, তিনি আমার মতোই একজন নবী ছিলেন।" আদ্দাসের উপস্থিতিতেই আল্লাহ তা'য়ালা ইউনুস (আঃ)'র ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আয়াত নাজিল করলেন [সূরা আল-আম্বিয়া, সূরা নম্বর ২১, আয়াত ৮৭-৮৮] :
** আর স্মরণ করুন মাছের অধিকারীর [ইউনুস (আঃ)] কথা, যখন সে রাগকরে চলে গিয়েছিলো, আর ভেবেছিল আমরা তাঁকে পাকড়াও করবো না। আর সে গভীর অন্ধকার থেকে ডেকে বলেছিল: 'লা-ইলাহা ইল্লা আন্তা, সুবহানাকা, ইন্নি কুনতু মিনাজ্বলিমীন'[তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, পবিত্রতা তোমারই, নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছি]। আমরা তখন তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম আর তাঁকে দুঃশ্চিন্তা থেকে উদ্ধার করেছিলাম। আর এভাবেই মু'মিনদেরকে আমরা উদ্ধার করে থাকি। **
আল্লাহ তা'য়ালা যেন রাসূল (সাঃ) কে সান্তনা দিলেন। তাঁর আগের নবীদের ঘটনা, তাঁদের দোয়া আর উদ্ধারের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে যেন আশ্বাস দিলেন। তাইফের এই ঘটনার পরে আরেকটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। মক্কায় ফেরার পথে নাখলা নামের এক জায়গায় রাতে রাসূল (সাঃ) আর জায়েদ (রাঃ) থামেন। স্বভাবমাফিক রাতে তাহাজ্জুদের নামাজে রাসূল (সাঃ) দাঁড়িয়ে তেলাওয়াত করতে থাকেন। রাসূল (সাঃ)'র তাহাজ্জুদ লম্বা হতো। পরে আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনের আয়াত নাজিল করে সেই সময় আর কী ঘটেছিলো সেটা বর্ণনা করেন [সূরা আল-আহকাফ, সূরা নম্বর ৪৬, আয়াত ২৯]:
** স্মরণ কর, যখন জ্বিনদের একটি দলকে তোমার প্রতি ফিরিয়ে দিয়েছিলাম যারা কুরআন শুনছিল। তারা যখন সে স্থানে উপস্থিত হল, তখন তারা পরস্পরে বলল- 'চুপ করে শুন"। পড়া যখন শেষ হল তখন তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেল সতর্ককারীরূপে। **
এই জ্বীন [অদৃশ্য জীবসম্প্রদায়, যারা মানুষের মতোই ভালো-মন্দের বিচার করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে] নাকি নাসীবিন নামের এক জায়গা থেকে এসেছিল [যা বর্তমানে তুর্কি]। আল্লাহ তা'য়ালা যেন রাসূল (সাঃ) কে আরো বলছেন তোমার কাছে যেই কুরআন নাজিল হয়েছে, সেটা দিয়ে আপাতঃ ভাবে মক্কা-তাইফের মানুষরা হেদায়াত না পেলেও অন্য অদৃশ্য জীবসম্প্রদায়, জ্বীনরা ঠিকই হেদায়াত প্রাপ্ত হয়েছে। তারা শুধু নিজেরাই না, তাদের অন্যদের কাছে সতর্ককারী হিসাবে, হেদায়াতকারী হিসাবে ফিরে গেছে।
আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনের অন্য আয়াতে রাসূল (সাঃ) কে জানাচ্ছেন [সূরা আল-জ্বীন, সূরা নম্বর ৭২, আয়াত ১ - ৩] :
** বলুন, ‘আমার প্রতি ওহী নাযিল হয়েছে যে, জিনদের একটি দল মনোযোগের সাথে শুনেছে অতঃপর বলেছে, ‘আমরা তো এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি, যা সত্যের দিকে হেদায়াত করে; ফলে আমরা এতে ঈমান এনেছি। আর আমরা কখনো আমাদের রবের সাথে কাউকে শরীক করব না, আর নিশ্চয়ই আমাদের রবের মর্যাদা সমুচ্চ; তিনি গ্ৰহণ করেননি কোনো সঙ্গিনী এবং না কোন সন্তান। **
এই কুরআন যে মানুষ আর জ্বীন দুই সম্প্রদায়ের জন্যই নাজিল হয়েছে সেটা সূরা আর-রহমানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব আয়াতেই পরিষ্কার। [সাইডনোট: যেমন: সূরা আর-রহমান, সূরা নম্বর ৫৫, আয়াত ১৩। সূরা আর-রহমানের "ফাবি আইয়ি আলা ইরাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান" এই আয়াতে 'রাব্বি কুমা' শব্দের অর্থ 'তোমাদের দুইয়ের রবের', আর পুরাটার অর্থ: "অতএব (হে জ্বিন ও মানুষ!) তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন্ কোন্ নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?, ভেবে দেখুন, আরবি ব্যাকরণ না জানলে অর্থের এই সুক্ষ তফাৎ কি কখনো উপলব্ধি করা সম্ভব?] আর সূরা আল-আম্বিয়া [সূরা নম্বর ২১, আয়াত ১০৭] তে আল্লাহ তা'য়ালা নিশ্চিত করছেন:
** (মুহাম্মদ ) আর আমরা তো আপনাকে সব সৃষ্টিকুলের জন্য শুধু রহমতরূপেই পাঠিয়েছি। **
যাই হোক, ঘটনাবহুল তাইফের যাত্রার পর মক্কায় ফিরে ঢোকার আগে রাসূল (সাঃ) তাঁর জিম্মাদারী কে নিবে জানতে লোক পাঠালে সবাই একে একে না করলেও, মুত'ইম ইবনে আ'দি রাজি হন। তিনি মুসলিম নন, কিন্তু তাও রাসূল (সাঃ) কে সুরক্ষা দিতে তাঁর চার ছেলেকেই তরবারি-ঢাল সহ রাসূল (সাঃ)'র কাছে পাঠান। এই সেই মুত'ইম ইবনে আদি যে কিনা অন্যদের সাথে মুসলিমদের উপর কুরাইশদের বয়কট বাতিলের জন্য চেষ্টা করেন।
এই তাইফের ঘটনা রাসূল (সাঃ)'র উপর এতটাই প্রভাব ফেলেছিলো যে রাসূল (সাঃ) কে আয়েশা (রাঃ) একবার নাকি জিজ্ঞেস করেছিলেন উহুদের যুদ্ধের চেয়েও [যেই যুদ্ধে মুসলিমরা কুরাইশদের কাছে পরাজিত হয়েছিল, রাসূল (সাঃ)'র চাচা হামজা (রাঃ) সহ অনেক সাহাবী শহীদ হয়েছিলেন, রাসূল (সাঃ) নিজেও মারাত্মক আহত হয়েছিলেন, গুজব রটে গিয়েছিলো যে তিনি মারা গেছেন] খারাপ দিন তাঁর জীবনে এসেছিলো কিনা? উত্তরে রাসূল (সাঃ) হ্যাঁ বলে তাইফের ঘটনা উল্লেখ করেছিলেন। আরেকটা হাদিস আছে যেইখানে তাইফের ওই ঘটনার পরে কিভাবে আল্লাহ তা'য়ালার নির্দেশে জিরাইল (আঃ) পাহাড়ের ফেরেশতা নিয়ে এসে রাসূল (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে তিনি তাইফবাসীকে শাস্তি দিতে চান কিনা? তিনি বললেই পাহাড়ের ফেরেশতা দুই পাহাড়ের মাঝে তাদের পিষে ফেলতে পারেন। উত্তরে রাসূল (সাঃ) কি বলেছিলেন, আর কী দোয়া করেছিলেন, আর সেটা কিভাবে পরে কবুল হয় -- সেটা না হয় পাঠকের উপর খুঁজে বের করার জন্য রেখে দিলাম।
সবশেষ: আজকের পর্ব পর্যন্ত কুরআনের মোট আয়াতের ৪.৩১% কভার হয়েছে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন