এই শুক্রবারের খুতবার সারমর্ম (২৩ জানুয়ারি, ২০২৬): মন শান্ত, সন্তুষ্ট রাখার উপায়

এই শুক্রবারের খুতবার সারমর্ম (২৩ জানুয়ারি, ২০২৬): মন শান্ত, সন্তুষ্ট রাখার উপায় 
শেখ ইউসুফ বাকির । মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন । ওয়েস্ট উইন্ডসর, নিউ জার্সি


শেখ ইউসুফ বাকির যখনই শুক্রবারের জুমুআর খুতবা দেন, তিনি প্রায়ই তাঁর কোনো এক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। এই শুক্রবারেও তিনি এমনি এক কাহিনী বললেন। নিউ জার্সি থেকে মুসলিম তরুণদের একদলকে নিয়ে তিনি কেনিয়া সফরে গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য, এই মুসলিম তরুণদের আরামের, সাচ্ছন্দের বলয় থেকে বের করে নিয়ে মুসলিম উম্মাহর অন্যদের, যারা তাদের মতো এতটা সৌভাগ্যবান নয়, তাদের অবস্থা দেখানো, দুনিয়ার আসল চেহারার সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দেয়া। ইমাম বললেন, কেনিয়ার নাইরোবিতে পৌঁছে তাঁদের প্রথম গন্তব্য ছিল এক হাসপাতাল - যেটা কিনা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন বাচ্চাদের জন্য চিকিৎসা, থেরাপি দিয়ে থাকে। 

সেখানে তিনি এক মহিলার সাথে পরিচিতি হন, যিনি "মুহাম্মদের মা" হিসাবে পরিচিত। মুহাম্মদ অটিস্টিক, এর সাথেও তার অন্য সমস্যাও আছে। মুহাম্মদের মা - একাই মুহাম্মদের দেখাশোনা করেন। খুবই গরিব। দেখেই বোঝা যায়, তাদের প্রতিদিনের সংস্থানের কোনো নিশ্চয়তা নাই। কিন্তু এই মুহাম্মদের মা'এর একটা বৈশিষ্ট্য ইমামের চোখে পড়েছে, মহিলা সব সময়ই হাসি মুখে থাকেন। আর তাই কৌতূহল বশতঃ তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেই ফেলেন যে কিভাবে তিনি সবসময় এতো হাসিখুশি থাকেন? ওই মহিলা নাকি তাঁকে দুইটা উত্তর দেয়। ইমাম তাঁর হাতে থাকা একটা ছোট বই, যেটার নাম [বেশ কঠিন, আমি ইউটুবে খুতবার রেকর্ডিং দেখে পরে চ্যাট জিপিটির সাহায্যে বের করলাম]: "আল ওসায়িল আল মুফিদা লিআল হায়াত আল সায়িদা" - যার বাংলা দাঁড়ায়,  [কুরআন-সুন্নাহর আলোকে] "দুনিয়ার জীবনে সুখী থাকার উপকারী উপায়" বা "সুখী জীবনের উপকারী উপায়সমূহ"  - এই বই দেখিয়ে বললেন: ওই মহিলার দুইটা উত্তর তাঁকে এই বইটা, যেটা তিনি প্রায়ই পড়েন, অন্যদেরকেও পড়ান - প্রতিবারই বইটাকে অন্যভাবে উপলব্ধি করায়। আর তিনি আজকে ওই মহিলার ওই দুইটা উত্তর শেয়ার করার উদ্দেশ্যেই তিনি খুতবাতে এর আলোচনা করছেন।

প্রথমেই নাকি মহিলা বলেন, 'আলহামদুলিল্লাহ'! ইমাম না পেরে নাকি জিজ্ঞেস করে ফেলেন, কিসের জন্য আলহামদুলিল্লাহ বলছো? তোমার ছেলে অসুস্থ, এরপরও কিভাবে শুকরানা আদায় করছো? উত্তরে নাকি মহিলা বলেন, তাঁর পরিচিত একজন আছেন, যার তিনটা বাচ্চাই অসুস্থ আর তাদের হাসপাতালে থেরাপি দিতে নিয়ে আসার অবস্থায়ও নাই। কাজেই, তাদের থেকে তো তিনি ভালো আছেন, আর তাই তিনি 'আলহামদুলিল্লাহ' বলতে পারেন! ইমাম ওই বই থেকে দেখে বললেন, রাসূল (সাঃ)'র সেই হাদিসটা কী সুন্দর করেই না এই মহিলা মেনে চলছেন, যার ভাবার্থ অনেকটা এইরকম: রাসূল (সাঃ) নাকি বলছেন: "তোমরা তোমাদের থেকে যারা নিচে [দুনিয়াবী ব্যাপারে] তাদের দিকে তাকিও, যারা উপরে তাদের দিকে নয়, তাহলে তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহ'র নেয়ামতকে ছোট করে দেখবে না"।

এরপরও নাকি ইমামের মনে হচ্ছিলো, এই মহিলার আরও কিছু শক্তি আছে, যার কারণে তিনি এই  হাসিমুখে সন্তুষ্ট ভাবে আছেন। তিনি ওই মহিলাকে প্রশ্ন দিয়ে আরো চেপে ধরেন, তার অর্থনৈতিক অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করেন,  ভবিষ্যতে কী হবে - সেটা জিজ্ঞেস করেন। তখন নাকি ওই মহিলা যেই উত্তর দেন তা অনেকটা এইরকম: আল্লাহ তো আমাকে আজকের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, তাই আমি আগামীকালকের জন্য চিন্তিত নই [তিনি চাইলে আমাকে আগামীকালকের ব্যবস্থাও করে দিতে পারবেন]! ইমাম নাকি এই উত্তর শুনে মহিলার 'ইয়াকীন' দেখে অবাক হন। ইমাম বললেন, আপাতঃ দৃষ্টিতে এই মহিলার কিছুই নাই, কিন্তু এই যে বিশ্বাস, এই বিশ্বাসই তাকে পথ চলার শক্তি যোগায় - যা আপনার আমার কাছে অনেক সময়ই বোধগম্য নয়। 

এরপর ইমাম বললেন, আমরা এতো সাচ্ছন্দের মধ্যে থেকেও সব সময়ই কত পেরেশানি করি: প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে, আমাদের মাথার উপর ছাদ, ঘরে খাবার, স্বাস্থ্য, সন্তান-সন্ততি সব থাকার পরও শোকরানা আদায় না করে, প্রথমেই ভাবি আজকের দিনটা না কত ব্যস্ততায় যাবে, কত কাজ! আমরা অনেক সময় অতীত নিয়ে ভাবি, আফসোস করি: কী হলো না, কী আরো ঠিকভাবে, অন্যভাবে করলে আজকে আরো ভালো থাকতাম, কেন এমন হলো; আর তা না হলে ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করি - যেখানে ভবিষ্যতে হাজারো উপায়ে ভিন্ন হতে পারে - যার কোনোটাই আমাদের নিয়ন্ত্রণে নাই। ইমাম ওই বইয়ের রেফারেন্স দিয়ে বললেন, এই দুইটাই - অতীত নিয়ে আফসোস, আর ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তা - দুইটাই হতাশাপূর্ণ জীবনের রেসিপি। অতীত বদলানো যাবে না, যা হওয়ার হয়ে গেছে, আর ভবিষ্যতও আমাদের নিয়ন্ত্রণে নাই - কাজেই সেগুলো নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে আমাদের বরং উচিত, আমাদের যা আছে সেটা নিয়ে শোকরানা করে, আমাদের থেকে যারা সুবিধা বঞ্চিত আছে সবসময় তাদের কথা ভেবে বর্তমানে আমি কী করতে পারি - সেটা নিয়ে ভাবা, কাজ করা আর এরপর ফলাফল, ভবিষ্যত আল্লাহর উপরে ছেড়ে দেয়া। 

ইমাম এরপর রাসূল (সাঃ)'র একটা শেখানো দোয়া বললেন: রাসূল (সাঃ) দুশ্চিন্তা আর হতাশা/আফসোস/দুঃখ  থেকে বাঁচার দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন: "আল্লাহুম্মা আউযুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযান"  - ও আল্লাহ আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাইছি দুশ্চিন্তা আর হতাশা/আফসোস/দুঃখ থেকে।  

সবশেষে, ইমাম বললেন ওই 'মুহাম্মদের মা' যা আছে তাই নিয়ে শোকরানা আর ভবিষ্যতের জন্য আল্লাহর উপর বিশ্বাস/তাক্বওয়া  নিয়ে ভরসা করার জ্বলন্ত উদাহরণ। যেই আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের অতীতে দেখভাল করেছেন, তিনিই ভবিষ্যতেও আমাদের দেখভাল করবেন - আমরা যারাই তার মতো হতে পারবো, তারাই জীবনে শান্ত আর সন্তুষ্ট হৃদয় নিয়ে বাঁচতে পারবো। আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের সবাইকে সেই তৌফিক দেন, আমিন। 

[
খুতবার লিংক: https://www.youtube.com/live/fXlDRYeALB0?si=sXBOwIfjCgwezhy-
আগের সবগুলো লেখা এক জায়গায় পাওয়ার জন্য লিংক: https://banglakhutba.substack.com/archive
]

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ