কুরআনের যে আয়াত গুলো আমাকে ধাক্কা দিয়েছে।
কুরআনের যে আয়াত গুলো আমাকে ধাক্কা দিয়েছে।
১৪ মার্চ ২০২৬, শনিবার
ডিসক্লাইমার: আজকের লেখা কোনো খুতবার সারমর্ম না। অনেকটা নিজের রিফ্লেকশন বা উপলব্ধি বলতে পারেন। আর পুরো লেখাটা নিচের লিংকেও পাওয়া যাবে:
https://banglakhutba.substack.com/p/7f8
কোভিড-১৯'র মধ্যে বাসায় বন্দি থাকা অবস্থায় আমরা কয়েকজন মিলে মেসেন্জারে কুরআনের একটা স্টাডি গ্রুপ খুলেছিলাম। যতদূর মনে পড়ে প্রতি শনিবার রুটিন করে আমরা ভাই-ব্রাদাররা এক-দেড় ঘন্টার জন্য অনলাইনে জুমে বসতাম। আমাদের মধ্যে কয়েকজন বাইয়্যেনা থেকে আরবির উপর একটা কোর্স করেছিল। মূলতঃ সেই কোর্স-এর মেটিরিয়াল ব্যবহার করে ওরা ক্লাস নিতো। আর আমরা যে যা পারি শিখতাম, নিজেদের মধ্যে আলাপ করতাম। শুধু যে সিরিয়াস পড়াশুনা, আলোচনা হতো তা না। অন্য অনেক গল্প, কাজে অভিজ্ঞতা শেয়ার করা ছাড়াও একজন আরেকজনকে পচানোও হতো। গ্রুপে ভালো ছাত্র যেমন ছিল, আবার চরম ফাঁকিবাজও ছিল। আমার সবচেয়ে ভালো যে বিষয়টা লাগতো তা হচ্ছে: কেউ কাউকে 'জাজ' করার কিছু ছিল না। সবাই মন খুলে যে যার অবস্থা, কুরআনের-ইসলামের কোনো খটকা বা প্রশ্ন করতে পারতো। আমরা আলাপ করতাম।
যাইহোক, সেই গ্রুপ অনেকদিন ধরেই চুপচাপ। করোনার পরে সবাই যে যার মতো ব্যস্ত হয়ে পড়ায় আর বসা হয় না। এর মধ্যে গ্রুপে নতুন করে জয়েন করলেন এক বড় ভাই। নতুন রক্ত, এসেই একের পর এক মেসেজ, তাঁর নতুন কিছু শেখা জিনিস, নোট গ্রুপে শেয়ার করতে লাগলেন। গ্রুপটা যেন আবার একটু নড়ে চড়ে উঠলো। এর মধ্যে প্রস্তাব হলো, যেহেতু রোজার মাস কুরআনের মাস, সবাই কমবেশি কুরআন পড়ছি, চলেন একদিন বসি: কুরআন পড়তে গিয়ে কোনো আয়াত 'ধাক্কা' দিয়ে থাকলে, মনে-অন্তরে নাড়া দিয়ে থাকলে, সেটা যে যার মতো করে শেয়ার করি। আমি আমারটা শেয়ার করার জন্য লিখছি। লেখা একটু লম্বা হবে। ধৈর্য্য নিয়ে পড়ার জন্য আগাম ধন্যবাদ।
প্রথমে কনটেক্সট বোঝার জন্য আমার তিনটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি।
ঘটনা-১: আমাদের সমাজে এমন পরিবার পাওয়া যাবে যাদের মা-বাবা'র কার্যকলাপ ভালো না, সমাজে অনেক বদনাম আছে। কিন্তু তাদের সন্তানরা মোটেও সে রকম না। বরং ঠিক উল্টা, তাদের ব্যবহার যেমন ভালো, তেমনই ইসলাম পালন করার উদাহরণ আছে।
ঘটনা- ২: আবার এমন পরিবারও আছে, যাদের মা-বাবা আমল-ওয়ালা, কিন্তু সন্তানরা ইসলামের উপর ঠিকভাবে নাই, আমল করে না, মাঝে মাঝে আবার ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করে সাংঘাতিক সব মন্তব্য করে বসে। আমরা অনেককেই বলতে শুনেছি: 'আলেমের ঘরে জালেম' কিংবা 'হ্বাজীর পোলা, পাজি হয়'!
ঘটনা- ৩: আমাদের মসজিদের তারাবিতে মিশরীয় ইমাম, শেখ ইসমাঈল ঈসা নামাজ পড়ান। তাঁর কুরআন তেলাওয়াতের মতো সুমধুর তেলাওয়াত আমি আগে কোথাও শুনি নাই। আর তিনি অর্থ বুঝে তেলাওয়াত করেন দেখে প্রায়ই তারাবির সময় বিভিন্ন আয়াতে আবেগ-প্রবণ হয়ে যান। তাঁর গলা ধরে আসে, কখনো কখনো কেঁদে ফেলেন। গত কয়েকবছর ধরে আমি Tarteel নামের একটা মোবাইল এপ ব্যবহার করে তারাবির সময় ইমামের তেলাওয়াতের সাথে সাথে অর্থ ফলো করি। প্রতি বছরই, সূরা হুদের একটা নির্দিষ্ট আয়াতে এসে (সূরা নম্বর ১১, আয়াত ৪৫-৪৬), ইমামের গলা কেঁপে ওঠে, গলা ধরে আসে, তিনি কোনোরকম কান্না আটকিয়ে, কয়েকবারের চেষ্টায় তেলাওয়াত করেন। কী আছে সেই আয়াতে যে তিনি এতো আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন? এখন অর্থ জেনে ফলো করায় আমি জানি। আর সেই দুই আয়াতই আমার জন্য চরম 'ধাক্কা' -র কারণ। নিচে লিখছি।
আমি প্রায়ই ভাবতাম, খারাপ মানুষের সন্তান ভালো হয় কিভাবে (গ্রুপ-১)? আবার ভালো মানুষের সন্তান, যাদের বাবা-মা চেষ্টার কোনো ত্রুটি করেন নাই - এদের সন্তানরা খারাপ হয় কিভাবে (গ্রুপ-২)? কুরআন নিয়ে কিছু পড়াশুনা করতে গিয়ে দেখলাম, এটা খুবই সম্ভব, আল্লাহ তা'য়ালা উদাহরণ দিয়ে এই দুই গ্ৰুপের কথাই বলে দিয়েছেন।
গ্রুপ - ১: ইব্রাহিম (আঃ)'র বাবা মূর্তি-পূজা করতেন। শুধু তাই না, মূর্তি-বানিয়ে ব্যবসাও করতেন। ইসলামে 'শিরক' সবচেয়ে বড় গুনাহ। কিন্তু তার সন্তান হয়েও ইব্রাহিম (আঃ) হেদায়াত প্রাপ্ত। ইসলামের অন্যতম প্রভাবশালী রাসূল! বাবাকে শোধরানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। প্রথমদিকে বাবার হেদায়াতের জন্য দোয়াও করেন, কিন্তু পরে যখন বুঝতে পারেন সম্ভব না, তখন বাদ দিয়ে দেন।
গ্রুপ -২ : নূহ (আঃ) যখন কয়েকশো বছরের চেষ্টায়ও তার লোকজনকে হেদায়াতের দাওয়াত দিয়ে ব্যর্থ। তখন আল্লাহ তাঁকে একটা জাহাজ/নৌকা বানাতে বলেন, আর সেই জাহাজে তিনি প্রত্যেক প্রাণী প্রজাতির জোড়া, তাঁর পরিবার, তবে তাদের ছাড়া যাদের ব্যাপারে আগেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে, আর যারা ঈমান এনেছে তাঁদের তুলে নিতে বললেন [সূরা হুদ, সূরা নম্বর ১১, আয়াত ৪০'র অংশবিশেষ]। লোকজন হাসাহাসি করলো। কিন্তু যখন শাস্তি হিসাবে বন্যার পানি শুরু হয়ে সবকিছু ডুবিয়ে দিতে শুরু হলো, নূহ (আঃ) দেখলেন তাঁর ছেলে সাথে নাই। তাঁর ছেলে অন্যদের সাথে। নূহ (আঃ) তাঁর ছেলেকে দেখতে পেয়ে জাহাজে উঠতে বললেও সে বলে সে পাহাড়ের চূড়ায় উঠবে, তাতেই সে বন্যা থেকে রক্ষা পাবে [সূরা হুদ, সূরা নম্বর ১১, আয়াত ৪২ - ৪৩]। কিন্তু তার শেষ রক্ষা হয় না, সে বাকিদের সাথে ডুবে মারা যায়।
আর এর কিছু পরের দুই আয়াতই আমার কাছে সবচেয়ে ধাক্কা লাগে। আল্লাহ তা'য়ালা বলছেন, সূরা হুদ, সূরা নম্বর ১১, আয়াত ৪৫ - ৪৬:
وَنَادَىٰ نُوحٌۭ رَّبَّهُۥ فَقَالَ رَبِّ إِنَّ ٱبْنِى مِنْ أَهْلِى وَإِنَّ وَعْدَكَ ٱلْحَقُّ وَأَنتَ أَحْكَمُ ٱلْحَـٰكِمِينَقَالَ * يَـٰنُوحُ إِنَّهُۥ لَيْسَ مِنْ أَهْلِكَ ۖ إِنَّهُۥ عَمَلٌ غَيْرُ صَـٰلِحٍۢ ۖ فَلَا تَسْـَٔلْنِ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِۦ عِلْمٌ ۖ إِنِّىٓ أَعِظُكَ أَن تَكُونَ مِنَ ٱلْجَـٰهِلِينَ
এই আয়াতে স্পষ্ট যে নূহ (আঃ) তাঁর ছেলে যে অসৎ - বা কাফির, তিনি সেটা বুঝতে পারেন নাই। তিনি সম্ভবতঃ ভেবেছেন 'তবে তাদের ছাড়া যাদের ব্যাপারে আগেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে' -- এটা তাঁর স্ত্রীর সম্পর্কে বলা হয়েছে! আর তাই, আল্লাহ'র কাছে তিনি এক প্রকার জিজ্ঞেসই করে ফেলেছেন যে তাঁর ছেলে তো তাঁর পরিবারের অংশ, সে কেন রক্ষা পেলো না?! আল্লাহ তা'য়ালাও উত্তর দিয়েছেন: তুমি জানো না, যা আমি জানি! আল্লাহ যেন বলছেন অনেকটা এইরকম: তোমার ছেলে হলেও সে আসলে তোমার পরিবারের অংশ না!! ইসলামে কেবল রক্তের সম্পর্কই একমাত্র পরিবারের সম্পর্কের মাপকাঠি না।
এই বছর শেখ ইসমাইল ঈসার তারাবিতে কুরআন তেলওয়াত/খতম লাইভ স্ট্রিমিং হয়েছে। আমি সূরা হুদ, সূরা নম্বর ১১, আয়াত ৩৬ - ৪৬ - এর এই আয়াত গুলোর রেকর্ডেড ভিডিও'র লিংক দিচ্ছি, সম্ভব হলে কুরআনের অনুবাদ সাথে নিয়ে দেখতে পারেন, ভিডিওর ৫৮ মিনিট থেকে ১:০২ মিনিট পর্যন্ত দেখার, তাঁর মুখের এক্সপ্রেশন, গলা ধরে আসা ইত্যাদি দেখার অনুরোধ থাকলো:
লিংক:
https://www.youtube.com/live/5OPwZHvt3p8?si=cKXDI1CxcK6kSZVz&t=3514
যাই হোক, আমি আরো ভাবতাম, কেউ জান্নাতি হলে তো তার সাথে তাঁর পরিবারও থাকবে - এমনটাই তো জানতাম। তাহলে? আল্লাহ তা'তায়ালা সূরা তুরে সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন [সূরা তুর, সূরা ৫২, আয়াত ২১]:
وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَٱتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُم بِإِيمَـٰنٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَآ أَلَتْنَـٰهُم مِّنْ عَمَلِهِم مِّن شَىْءٍۢ ۚ كُلُّ ٱمْرِئٍۭ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌۭ
বাংলায় অর্থ: "যারা ঈমান আনে আর তাদের সন্তান সন্ততিরা ঈমানের সাথে পিতামাতাকে অনুসরণ করে, আমি তাদের সাথে তাদের সন্তান সন্ততিকে মিলিত করব। তাদের ‘আমালের কোন কিছু থেকেই আমি তাদেরকে বঞ্চিত করব না। প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়বদ্ধ।"
অর্থাৎ, ঈমানের প্রশ্নে কোনো আপস নাই। কোনো ঈমানদার মানুষের ছেলে-মেয়ে, অথবা কোনো ঈমানদারের বাবা-মা দেখেই যে কেউ শেষ বিচারের দিনে পার পেয়ে যাবে - তা হবে না। কেবল মাত্র "যারা ঈমান আনে আর তাদের সন্তান সন্ততিরা ঈমানের সাথে পিতামাতাকে অনুসরণ করে" -- তারাই সফলকাম হবে।
গ্রুপ ১: স্বামী- স্ত্রী দুই জনই খারাপ: আবু লাহাব আর তার স্ত্রী [সূরা মাসাদ/লাহাব, সূরা নম্বর ১১১];
গ্রুপ ২: স্বামী খারাপ - স্ত্রী ভালো: ফিরাউন আর তার স্ত্রী [সূরা আত-তাহরিম, সূরা নম্বর ৬৬, আয়াত ১১];
গ্রুপ ৩: স্বামী ভালো - স্ত্রী খারাপ: নূহ (আঃ) ও তাঁর স্ত্রী, লুত (আঃ) আর তাঁর স্ত্রী [সূরা আত-তাহরিম, সূরা নম্বর ৬৬, আয়াত ১০]
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন