এই শুক্রবারের খুতবার সারমর্ম (১৫ মে, ২০২৬): জাহেল আর গাফেল এর মধ্যে তফাৎ, আমাদের করণীয়
এই শুক্রবারের খুতবার সারমর্ম (১৫ মে, ২০২৬): জাহেল আর গাফেল এর মধ্যে তফাৎ, আমাদের করণীয়
ডা. আদম হেমাওয়ে । মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন । ওয়েস্ট উইন্ডসর, নিউ জার্সি
[ভূমিকা/ডিসক্লাইমার: জুমা'র নামাজের এই খতীবকে আগে কখনো দেখি নাই, নামও শুনি নাই। নামাজের আজানের পরপরই ইমাম খুতবা শুরু করার আগেই দেখলাম মসজিদের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ইমামকে 'এক-মিনিট' ইশারা করে মাইক্রোফোন নিলেন কিছু কথা বলার জন্য। বললেন, আজকের ইমাম ডা. আদম হেমাওয়ে, তিনি সামনে মার্কিন কংগ্রেসের প্রাইমারি নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন। তিনি একজন প্লাষ্টিক সার্জন। আমাদের মসজিদ যদিও কাউকে "সমর্থন" করে না, আমরা সবাই যে যার ইচ্ছা মতো ভোট দিবো, কিন্তু তারপরও তাঁর মনে হয়েছে ইমামকে সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দেয়া দরকার। কিন্তু তিনি খুতবা দিচ্ছেন নিতান্তুই 'খতিব' হিসাবে, নির্বাচনী বক্তব্য দিচ্ছেন না। এই বলে ইমামকে খুতবা শুরু করার অনুরোধ করলেন। আমি আমার 'তিনি কে?' এই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে নড়েচড়ে বসলাম। মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। নিচে সারমর্ম লেখারও চেষ্টা করছি। কিন্তু খুতবার ভিডিও রেকর্ডিং ইউটুবে খুঁজে পেলাম না। তাই পুরোটাই স্মৃতি থেকে লিখছি। আর শুধু মূল বক্তব্যটাই লিখছি, আমার ভুল হতে পারে।]
ইমাম বললেন আজকে তিনি আলাপ করবেন 'জাহেল' আর 'গাফেল' এই দুই শব্দের পার্থক্য নিয়ে। বললেন, জাহেল মানে হচ্ছে অজ্ঞতা (ignorance), আর গাফেল শব্দের অর্থ হচ্ছে "যায়-না-আসা/পাত্তা না দেয়া/উদাসীন" (heedlessness)। ইমাম বললেন, প্রাক-ইসলামী যুগের সময়কে জাহেলী যুগ বলা হয়, কারণ তখন তাঁরা ইসলাম সম্পর্কে জানতো না। কুরআন নাজিল হয় নাই, রাসূলের (সাঃ) সুন্নত মানুষকে গাইড করার জন্য ছিল না। এ যেন অন্ধকারে আলোর অভাবে দিক খুঁজে না পেয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা। কিন্তু যখন ইসলাম এলো, কুরআন নাজিল হলো, আমাদের কাছে রাসূল (সাঃ)'র সুন্নত আছে, এটা সত্য তা আমরা জানি, কিন্তু ঠিক মতো মানি না - এইটা 'গাফিলতি' বা গাফেল। এ যেন অন্ধকারে আলোর সন্ধান আছে, কিন্তু সেই আলো ব্যবহার করে সামনে যেতে আমরা চাই না, আলো ব্যবহার করতে আমরা অনাগ্রহী।
এরপর ইমাম বললেন, আমরা অনেক সময়ই আমাদের আত্মিক দ্বায়িত্ব নিয়ে খুব সিরিয়াস - নামাজ, রোজা, হ্বজ, জাকাত - ইত্যাদি, এবং সেটা হওয়া উচিতও, কিন্তু আমরা অনেক সময় আমাদের কর্তব্য নিয়ে উদাসীন। ইমাম বললেন, শেষ বিচারের দিন যে শুধু আমাদের ফরজ ইবাদত নিয়েই জিজ্ঞেস করা হবে, তা না বরং সাথে আমাদের কৃতকর্ম - আমাদের যা করা উচিত, কিংবা যা করা উচিৎ না - দুটো নিয়েই জিজ্ঞেস করা হবে। এরপর ইমাম মন্তব্য করলেন, আমরা আবার অনেক সময় ছোট-খাট বিষয় নিয়ে বেশি চিন্তিত হয়ে পড়ি, কিন্তু বড় বড় দায়িত্বের কথা ভুলে যাই।
এরপর ইমাম সরাসরি বলে ফেললেন, আমাদের মুসলিম কমিউনিটিতে আমেরিকার নির্বাচনে ভোট দেয়া ঠিক কিনা - সেটা নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু ভোট দিয়ে যে ন্যায়পরায়ণ, যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচিত করা উচিত, যাতে করে শুধু আমেরিকার ভেতর আমাদের না, পৃথিবীর মুসলিম উম্মাহর স্বার্থ রক্ষা হয়, সেরকম নীতিমালা/পলিসি নিয়ে যেন পরিবর্তন হয় - সেদিকে নজর দিতে হবে সেটা আমরা ভুলে যাই। এরপর ইমাম বললেন, প্রতি খুতবায় ইমামরা আমাদের কুরআনের আয়াত দিয়ে স্মরণ করিয়ে দেন: [সূরা আল নাহলের আয়াত, সূরা নম্বর ১৬, আয়াত ৯০]:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَيَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ ۚ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
যার অর্থ: নিশ্চয় আল্লাহ্ আদল (ন্যায়পরায়ণতা), ইহসান (সদাচরণ) ও আত্মীয়-স্বজনকে ইতায়ি (দানের) নির্দেশ দেন এবং তিনি ফাহেশা (অশ্লীলতা), মুনকার (অসৎকাজ) ও বাগি (সীমালঙ্ঘন) থেকে নিষেধ করেন; তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।
ইমাম বললেন, আমরা অনেক সময়ই ভাবি যত অন্যায়, সীমালঙ্ঘন, অসৎকাজ কিংবা অশ্লীলতা আছে - সেটার ব্যাপারে অন্য কেউ এসে বাধা দিবে, কিছু একটা করবে। কিন্তু উপরের এই আয়াতে আল্লাহ তা'য়ালা স্পষ্টতই আমাদের নিজেদেরকেই সেই ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে বলছেন। আমরা নিজেরা যদি কিছু একটা না করি - তাহলে আমাদের অবস্থার পরিবর্তন হবে না। এরপর ইমাম আরেকটা আয়াত উদ্বৃতি দিলেন যেইখানে আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন [সূরা আর-রাদ, সূরা নম্বর ১৩, আয়াত ১১-র অংশ]:
إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ
ইমাম বললেন, আমরা আমেরিকার মতো শক্তিশালী একটা দেশে আছি। এর নির্বাচনে আমাদের অবশ্যই ভোট দেয়া উচিত। আমাদের দায়িত্ব ভোটের ব্যালটে কারা আছে, তাদের নির্বাচনী ইশতেহার কী, কারা ন্যায়ের পক্ষে, যাদের কথা বলার কেউ নেই, তাদের কথা বলবে - সেই প্রার্থী করা, সেটা জানা আর তারপর ভোট নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়া। ইমাম স্মরণ করিয়ে দিলেন, মুসা (আঃ) কিন্তু ফিরাউনের প্রাসাদের ভেতরের লোকই ছিলেন। আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে সেখানে বসিয়ে বনি-ইসরাইলিদের পক্ষে কথা বলার, তাদের ভাগ্য আর অবস্থা পরিবর্তনের, ইসলাম প্রচারের জন্য দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আমরা আমেরিকার ভেতরে বসে যদি ভোট না দিয়ে, অবস্থা পরিবর্তন, পলিসি পরিবর্তন আর আমাদের ট্যাক্সের টাকা কোথায় খরচ হচ্ছে - সেটা নির্ধারণে ভূমিকা না রাখি - তাহলে আমাদের দায়িত্বে অবহেলা করা হবে, গাফিলতি করা হবে। আগামী ২ জুন, আমেরিকার প্রাইমারি ইলেকশনে তাই আমাদের অবশ্যই ভোট দিতে হবে।
নামাজের পর মসজিদের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আবারো মাইক্রোফোন নিলেন, একটা সমীক্ষার উল্লেখ করে বললেন, নিউ জার্সিতে এইসব প্রাইমারি ইলেকশনে মুসলিম ভোটারদের নাকি মাত্র ২% ভোট দেয়। যেখানে অন্য ধর্মের, যেমন ইহুদিরা, ক্রিষ্টানরা অনেক বেশি পরিমানে ভোট দেয়। মন্তব্য করলেন, আমরা কোনো ইস্যুতে বাস ভাড়া করে ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রতিবাদ ৱ্যালি করতে যাই, সচেতনতা বাড়াতে অনেক সভা করি, কিন্তু এইসব গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে ভোট না দিয়ে আসল পরিবর্তন আনতে ভূমিকা রাখি না - আমাদের এতে লজ্জা হওয়া উচিত (Shame on us)।
[সবশেষ, সম্পূর্ণ আমার মত: খুতবার শুরুতে যদিও এটা 'খুতবা', কোনো নির্বাচনী বক্তব্য না বলা হয়েছে, আদতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতেই বলা হয়েছে - সে হিসাবে এটা একপ্রকার নির্বাচনী বক্তব্যই ছিল। আমার মনে হয়, খুতবায় সম-সাময়িক বিষয় নিয়ে অবশ্যই আলাপ হওয়া উচিত, শুধু আত্মিক কিংবা আধ্যাতিক বিষয় নিয়ে না। ইদানিং খুতবার সারমর্ম সব সময় আর লেখা হয় না, কিন্তু আজকে মনে হয়েছে, কিছু করতে না পারলেও এই খুতবা শেয়ার করে সচেতনতা বাড়ানো দরকার। তাই লিখলাম। আর সার্চ করে এই ডা. আদম হেমাওয়ে'র নির্বাচনী ওয়েবসাইট পাইলাম। ভদ্রলোক তো দেখি আর্মিতেও ডাক্তার ছিলেন! নিচে লিংক শেয়ার করছি। https://hamawyfornj.com/about]
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন