এই কুরবানীর ঈদের খুতবার সারমর্ম (২৭ মে, ২০২৬, বুধবার): কুরবানী, আল্লাহ সর্বদ্রষ্টা আর পরকালে প্রতিদান
ইমাম ইউসুফ হোসেন । মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন । ওয়েস্ট উইন্ডসর, নিউ জার্সি
[ভূমিকা/ডিসক্লাইমার: আজকের লেখা জুমুআর খুতবার সারমর্ম না। বরং এই কুরবানীর ঈদের নামাজের পর ইমাম যে খুতবা দিলেন, সেই খুতবার সারমর্ম। সাধারণত ঈদের খুতবা নামাজের পরে দেয়া হয় বলে সবারই মনে একটু অস্থিরতা দেখা যায়, সবার একটা তাড়া থাকে, খুতবা খুব একটা মনোযোগ দিয়ে শোনা হয় না। এই খুতবা শোনা আমার জানামতে ওয়াজিব হলেও অনেকেই দেখা যায় খুতবা শুরুর আগেই উঠে বাসায় রওনা দিয়ে দেন। আর খুতবা একটু লম্বা হলে তো কথাই নাই - খুতবা শোনা বাদ দিয়ে প্রায় সবাই এদিক-ওদিক তাকানো শুরু করে। যাই হোক, এই খুতবা একটু লম্বা হলেও এতটাই আকর্ষণীয় ভাবে ইমাম দিলেন যে আমি খুবই মনোযোগ দিয়ে উপভোগ করেছি। আর ঠিক করেছিলাম, ইনশাআল্লাহ এই খুতবার সারমর্মটা লিখবো, আর তাই লিখতে বসেছি। কোনোভাবেই লেখায় খুতবাটা ফুটিয়ে তোলা যাবে না, তাও লেখার চেষ্টা করছি]
ইমাম বললেন, কুরবানী বা ঈদ-উল-আযহা'র ঐতিহ্য যেই ঘটনা থেকে, সেই ইব্রাহিম (আঃ) আর তাঁর ছেলে ইসমাইল (আঃ)'র ঘটনা কম-বেশি আমরা সবাই জানি। তিনি বললেন, তিনি খুব বেশি গভীরে না গিয়ে আবারো সবাইকে মনে করিয়ে দিবেন, কুরআনে এসেছে [সূরা আস-সাফফাত, সূরা নম্বর ৩৭, আয়াত ১০২ - ১০৮], আর বাংলা অর্থ অনেকটা এইরকম: "অতঃপর তিনি যখন তার পিতার সাথে কাজ করার মত বয়সে উপনীত হলেন, তখন ইবরাহীম বললেন, 'হে প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি যবেহ করছি, এখন তোমার অভিমত কী বল?' তিনি বললেন, 'হে আমার পিতা! আপনি যা আদেশপ্ৰাপ্ত হয়েছেন তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।' অতঃপর যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করলেন এবং ইবরাহীম তার পুত্রকে উপুড় করে শায়িত করলেন, তখন আমরা তাকে ডেকে বললাম, ‘হে ইবরাহীম! আপনি তো স্বপ্নের আদেশ সত্যই পালন করলেন!’---এভাবেই আমরা মুহসিনদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি। অবশ্যই এটা ছিল এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি এক মহান কুরবানীর [ভেড়ার] বিনিময়ে পুত্রটিকে ছাড়িয়ে নিলাম।আর আমরা তার জন্য পরবর্তীদের মধ্যে সুনাম-সুখ্যাতি রেখে দিয়েছি।"
ইমাম বললেন, এখন আপাতঃ দৃষ্টিতে মনে হবে এই পুরো ঘটনায় - আজকের দুনিয়ার হিসাবে যেখানে আমরা শুধুই লাভ-ক্ষতির হিসাব করি - কোনো ফলাফলই তো হলো না: ঘটনা শুরুর আগে পিতা-পুত্র যেমন ছিলেন, তেমনিই থাকলেন, মাঝখান থেকে একটা ভেড়া কুরবানী হলো মাত্র, তাই না!?! ইমাম বললেন, আল্লাহ তা'য়ালা নিজেই এই প্রশ্নের উত্তর অন্য এক আয়াতে দিয়েছেন [সূরা আল-হ্বজ, সূরা নম্বর ২২, আয়াত ৩৭'র প্রথম অংশ], যার অর্থ অনেকটা এইরকম: "আল্লাহ্র কাছে না পৌঁছায় সেগুলোর [কুরবানীর প্রাণীর] গোশত আর না তাদের রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া"।
ইমাম বললেন, কাজেই আমাদের কুরবানী বা অন্য যেকোনো কাজের ফলাফল না বরং সেটা করার পেছনে আমাদের নিয়ত কী ছিল, সেটা তাকওয়ার উপর ভিত্তি করে ছিল কিনা, সেটাই আল্লাহ তা'য়ালার কাছে বিবেচ্য হবে।
এরপর ইমাম বললেন, আপনারা ২০ সেকেন্ডে একটু মনে মনে চিন্তা করে দেখেন তো: কখনো আপনাদের জীবনে এমন কখনো হয়েছে কিনা যে আপনি কোনো একটা কাজ ভালো নিয়তে করলেন - সেই ভালো কাজটা হতে পারে আপনি আপনার পরিবারের জন্য করেছেন কিংবা পিতা-মাতা, স্বশুরবাড়ির লোক, আত্মীয়-স্বজন এমনকি কাজের জায়গায় কলিগদের জন্য হয়তো করেছিলেন - কিন্তু তার ফলাফলটা কেউ যেন উপলব্ধি করলো না, কোনো রিকোগনিশন, এপ্রিসিয়েশন আপনি পেলেন না -- যেন আপনি কিছুই করেন নাই -- এমন কখনো হয়েছে কিনা? এমন হয়ে থাকলে এরপরের ঘটনাটা যেটা উনি বলবেন সেটা আমরা উপলব্ধি করে সান্তনা, উৎসাহ পেতে পারি।
ইমাম বললেন, মক্কায় কুরাইশদের কাছে খুবই সুনামসম্পন্ন একজন মানুষ ছিলেন মুসআব ইবনে উমাইর। তিনি একদিকে যেমন সুদর্শন তরুণ ছিলেন, অন্যদিকে অত্যন্ত ধনী ছিলেন। এমনও প্রচলিত ছিল যে তাঁর ব্যক্তিত্ব, চলাফেরা এতটাই নাকি কেতা-দুরস্ত (Aura) ছিল যে তিনি কোনো জায়গায় আসার আগেই নাকি যেন তাঁর সুগন্ধ সেখানে পৌঁছে গিয়ে মানুষ বুঝতো যে তিনি আসছেন। সেই মুসআব ইবনে উমাইর কুরআনের আয়াত শুনে ইসলাম কবুল করে রাসূল (সাঃ)'র সাহাবী হয়ে গেলেন। ফলে তাঁর (রাঃ) সুনাম, পারিবারিক বন্ধন, অর্থ-বৈভব সব হারাতে হলো। মুসআব ইবনে উমাইর (রাঃ) তাঁর কেতা-দুরস্ততা হারিয়ে গরিব সাধারণ হয়ে পড়লেন। রাসূলের (সাঃ) অন্যান্য সাহাবীরা নাকি তাঁকে দেখে আফসোস করে দুঃখে কেঁদে ফেলতেন - যে কী মানুষের আজকে কী অবস্থা! [রাসূল(সাঃ) নিজে মদিনায় হিজরতের আগেই মুসআব ইবনে উমাইর (রাঃ) কে মদিনায় পাঠিয়ে দেন, তাঁর হাতে নাকি অনেকেই ইসলাম কবুল করেন]। রাসূলের (সাঃ) হিজরতের পরে মদিনায় এই মুসআব ইবনে উমাইর (রাঃ) উহুদের যুদ্ধে মুসলিম পক্ষের পতাকাবাহক ছিলেন - যেটা অত্যন্ত সম্মানিত আর গুরুত্বপূর্ণ একটা দায়িত্ব ছিল। পতাকাবাহক হওয়ায় শত্রুর টার্গেটও ছিলেন। শত্রুর আক্রমণে প্রথমে এক হাত হারিয়ে তিনি অন্য হাতে পতাকার দন্ড ধরে ছিলেন। পরে অন্য হাত কাঁটা পড়লে তিনি নাকি দুই কাটা হাতের বাকি অংশ দিয়েই বুকের সাথে চেপে ধরে পতাকা উঁচু করে ধরে ছিলেন। কিন্তু শেষমেষ তিনি উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। যুদ্ধ শেষে যখন তার মরদেহ পাওয়া যায়, তখন তার শরীরে এতটাই অল্প কাপড় ছিল যে তাঁর পুরো শরীর নাকি ঢাকা যাচ্ছিলো না: মাথা ঢাকলে পা বের হয়ে যাচ্ছিলো, আর পা ঢাকলে মাথা! [শহীদরা নাকি যেই কাপড়ে মারা যান, সেই অবস্থায়ই দাফন করা হয়, কারণ তাঁদের পরণের কাপড়ই নাকি কাফনের কাপড়]। মুসআব ইবনে উমাইরের(রাঃ) মৃত্যুতে রাসূল (সাঃ) অত্যন্ত কষ্ট পান। পরে নাকি রাসূল (সাঃ)'র নির্দেশে তাঁর মাথা কাপড়ে ঢেকে, পা ঘাস-লতা-পাতা দিয়ে ঢেকে দাফন করা হয়।
ইমাম বললেন, আপাত দৃষ্টিতে দুনিয়াতে তিনি কিছু পেলেন না, যেন "হিরো থেকে জিরো" হয়ে চলে গেলেন। কিন্তু আসলে কী তাই? না, বরং উল্টো, তিনি "জিরো থেকে হিরো" হয়েই দুনিয়া থেকে গেলেন, আখিরাতে তিনি ইনশাআল্লাহ জান্নাত পাবেন।
ইমাম পরিষ্কার করলেন, আমরা চাইলেই ইব্রাহিম-ইসমাইল (আঃ)'র মতো, কিংবা মুসআব ইবনে উমাইর (রাঃ)'র মতো এতো বড় ত্যাগ স্বীকার করতে কিংবা এতো বড় পরীক্ষা দিতে পারবো না। কেউ আমাদেরকে সেটা করতে বলছেও না। ইমাম জোর দিয়ে মনে করিয়ে দিলেন, আমরা যেন ভুলে না যাই: আমরা জীবনে ছোটখাটো যেই ত্যাগ স্বীকার করছি, কুরবানী করছি, [ধৈর্য ধরে যে বিপদ পার করছি] সেটা তাকওয়ার উপর ভিত্তি করে হলে, আল্লাহ তা'য়ালা নিশ্চয়ই তা দেখছেন - তিনি সর্বদ্রষ্টা, সর্বজ্ঞানী। তিনিই এর বিনিময় দিবেন। আর তাই, আমরা যেন তাকওয়ার সাথে কোনো কাজ করতে নিরুৎসাহিত না হই, যদিও সেই কাজ দুনিয়ার বিচারে, অন্যদের চোখে কোনো 'কাজের কাজ' না হয়।
ইমাম সবশেষে আবারো মনে করিয়ে দিলেন: ইব্রাহিম (আঃ) আর তাঁর ছেলে ইসমাইল (আঃ)'র ত্যাগ এতটাই মহৎ আর গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে এতো বছর পরেও দুনিয়াতে বিলিয়ন বিলিয়ন মুসলিম আজও সেই ঘটনা স্মরণ করে প্রতি বছর কুরবানী করে, তাকবীর দেয়, আমরাও আজকে ঈদ পালন করছি।
[সবশেষ: যুদ্ধে মুসলিমদের পতাকাবাহকের দুইহাত কেটে যাওয়ার আরেকটা ঘটনা আছে: রাসূল (সাঃ)'র চাচাতো ভাই, আলী (রাঃ)'র আপন ভাই, জাফর বিন আবি তালিব (রাঃ) মুত'আ যুদ্ধে অনেকটা একইভাবে শহীদ হন। জাফর (রাঃ)'র সম্পর্কে একটা প্রচলিত হাদিসও আছে। তবে দুটো ঘটনা আলাদা, দুই সময়ের, দুইজন ভিন্ন ব্যক্তির: আমি নিজেই প্রথমে ভুলটা করেছিলাম, তাই খেয়াল করিয়ে দিচ্ছি: জাফর (রাঃ)'র সাথে মুসআব ইবনে উমাইর (রাঃ)'র ঘটনা মিলিয়ে ফেলবেন না।]
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন