এই শুক্রবারের খুতবার সারমর্ম (১০ জুলাই, ২০২৬): দিনে কুরআনের অন্তত একটা আয়াত পড়া

এই শুক্রবারের খুতবার সারমর্ম (১০ জুলাই, ২০২৬): দিনে কুরআনের অন্তত একটা আয়াত পড়া  
উস্তাদ মাশহুদ হোসেন । মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন । ওয়েস্ট উইন্ডসর, নিউ জার্সি


[ডিসক্লাইমার: খুতবাতে ইমাম অন্য অনেক কিছু আলাপ করেছেন। উদাহরণ দিয়েছেন। আমি সেসবের কিছুই না লিখে শুধু নতুন যে দুইটা হাদিসটা সম্পর্কে জানলাম সেটা নিয়ে তাঁর খুতবার মূল অংশ লিখছি। আর পরে আমার নিজের একটা উপলব্ধি/রিফ্লেকশন লিখবো। নিজের রিফ্লেকশন একটু ব্যক্তিগত হয়ে যাবে, লম্বা হয়ে যাওয়ার চান্স আছে, চেষ্ঠা করবো সংক্ষেপে লিখতে। ওই অংশ বাদ দিয়েও পড়তে পারেন।]

ইমাম একটা হাদিস বললেন যেখানে রাসূল (সাঃ) নাকি তাঁর সাহাবীদের বলেছেন: নিশ্চয়ই মানুষের মাঝে "আহলুল্লাহ" বা আল্লাহর পরিবার/লোক আছে। ইমাম বললেন, [ইসলামী আক্বিদা অনুযায়ী] আমরা জানি আল্লাহর কোনো পরিবার নাই, তাঁর সৃষ্টি হয় নাই [তিনি জন্ম নেন নাই], কাউকে জন্ম দেনও নাই [তাঁর কোনো সন্তান নাই] - তিনি এমনই এক সত্তা। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এরা কারা - সাহাবীরা কৌতূহলী হলে রাসূল (সাঃ) নাকি উত্তর দিয়েছেন: এরা হচ্ছে কুরআনের লোক, এরাই আল্লাহর বিশেষ বান্দা এবং তাঁর মনোনীত/নির্বাচিত মানুষ।

এরপর ইমাম যে হাদিসটা বললেন সেটা খুবই ইন্টারেষ্টিং, আমি আগে কোনোদিন শুনি নাই। রাসূল (সাঃ) নাকি বলেছেন, যার অর্থ অনেকটা এইরকম : 
"যে মুমিন কুরআন তিলাওয়াত করে, তার দৃষ্টান্ত "উত্রুজ্জাহ" (সাইট্রন/বাতাবীলেবু) ফলের মতো—এর সুঘ্রাণও মনোরম, স্বাদও মনোরম। আর যে মুমিন কুরআন তিলাওয়াত করে না, তার দৃষ্টান্ত খেজুরের মতো—এর কোনো সুঘ্রাণ নেই, কিন্তু স্বাদ মিষ্টি। আর যে মুনাফিক কুরআন তিলাওয়াত করে, তার দৃষ্টান্ত "রাইহানা" (সুগন্ধি তুলসীজাতীয় উদ্ভিদ)-এর মতো—এর সুঘ্রাণ মনোরম, কিন্তু স্বাদ তিক্ত। আর যে মুনাফিক কুরআন তিলাওয়াত করে না, তার দৃষ্টান্ত "হানযালা" (তিক্ত করলা/বুনো তিক্ত ফল)-এর মতো—এর কোনো সুঘ্রাণ নেই এবং স্বাদও তিক্ত।" 

এরপর ইমাম উপদেশ দিলেন: আমরা যেন কুরআন শেলফে তুলে না রাখি। ধুলো জমা কুরআন যেন শুধু রোজা/রমজানের সময় খুলে না পড়ি। এরপর অনেকটা সাইডনোট আকারে বললেন, খেয়াল করে দেখতে, রোজা মাস কিন্তু প্রতিবছর এগিয়ে আসে [চাঁদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১০ দিন এগিয়ে যায়]। আমরা যেন রোজার অপেক্ষায় না থেকে দিনে কমপক্ষে একটা আয়াত পড়ি। ইমাম বললেন, আল্লাহ তা'য়ালার কাছে যেকোনো আমলের কোয়ান্টিটি নয়, বরং কোয়ালিটি অর্থাৎ সংখ্যা নয়, বরং মান বেশি বিবেচ্য। আমরা চাইলে দিনে ১ আয়াতের বদলে ২ আয়াত, ১০ আয়াত কিংবা আরো অনেক বেশি আয়াত পড়তে পারি - উপরের মাত্রার কোনো শেষ নাই, কিন্তু কমপক্ষে ১ টা আয়াত যেন কুরআন হাতে নিয়ে আমরা প্রতিদিন পড়ি। কুরআন হাতে নিয়ে যদি আমরা চিন্তা করি, এইটা আল্লাহ'র বাণী, আমি আল্লাহ তা'য়ালার জন্য, সিন্সিয়ারলি/ইখলাসের সাথে শুধু ১ টা আয়াত তেলাওয়াত করবো, অর্থ বুঝে তাফসীর পড়বো - তাহলে আমাদের জীবন বদলে যাবে। 

এরপর ইমাম বললেন, ভেবে দেখুন তো, যদি আজকে বাদ জুমুআ সবাই বাসায় গিয়ে কুরআনের শুধু একটা আয়াত পড়ে, আর সেটা নিয়ে পরিবারের সবার সাথে একসাথে বসে সবাই মিলে যে যার আয়াত নিয়ে আলাপ করে - তাহলে কী সুন্দর একটা পারিবারিক কোয়ালিটি টাইম পাস হবে?! তিনি মসজিদের উপস্থিত মুরুব্বি, ছোট বাচ্চা, তাঁর সমবয়সী সবাইকে দিনে অন্তত কুরআনের ১ টা আয়াত পড়ার উপদেশ দিয়ে খুতবা শেষ করলেন। 

এইবার কয়েকদিন আগে নিজের পড়া একটা আয়াত নিয়ে রিফ্লেকশন/উপলব্ধি শেয়ার করছি। তার আগে সংক্ষেপে কনটেক্সটটা একটু বলে নেই। অনেকেই হয়তো জানেন গত বছর শেষের দিকে আমার চাকরি চলে যায়। প্রায় ৫ মাসের বেশি সময় ধরে চাকরি ছিল না। চাকরির বাজার খুব খারাপ, অনেক জায়গায় এপ্লাই করে ডাক পাচ্ছিলাম না, যাও দুই-একটা ইন্টারভিউ দিচ্ছিলাম, কয়েক রাউন্ড পার করেও শেষমেশ চাকরি হচ্ছিলো না। যাই হোক, মসজিদের এক ভাইয়ের রেফারেন্সে এই কয়েকমাস হলো একটা চাকরি পেয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ! এই সুযোগে বলে নেই: এই সময়টায় আমার জন্য অনেকেই দোয়া করেছেন, কেউ কেউ সরাসরি চাকরিতে রেফারেন্স দিয়ে, খোঁজখবর নিয়ে বা অন্যভাবে সাহায্য করার চেষ্টা করেছেন - আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ, আল্লাহ তা'য়ালা আপনাদের এর অনেকগুন বেশি প্রতিদান নিশ্চয়ই দিবেন  - এই দোয়া করি।

তো, এই সময়টাতে স্বাভাবিক ভাবেই ইবাদত, পড়াশুনা, দোয়া অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু চাকরি হয়ে যাওয়ার পর, এখন নানান কারণে, নানান ব্যস্ততায় সেই উদ্যোমে অনেকটা ভাটা পড়েছে। আর এর পরপরই সেইদিন নিচের আয়াতটা পড়লাম: [সূরা ফুসসিলাত, সূরা নম্বর ৪১, আয়াত ৫১]:

وَإِذَآ أَنْعَمْنَا عَلَى ٱلْإِنسَـٰنِ أَعْرَضَ وَنَـَٔا بِجَانِبِهِۦ وَإِذَا مَسَّهُ ٱلشَّرُّ فَذُو دُعَآءٍ عَرِيضٍۢ   

যার বাংলা অর্থ: "আর যখন আমরা মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করি তখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয় ও দূরে সরে যায়। আর যখন তাকে অকল্যাণ স্পর্শ করে তখন সে দীর্ঘ প্রার্থনাকারী হয়।"


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ